দাওয়াহ
আর্টিকেল সমগ্র ও ফাতওয়া
অন্যান্য
সাম্প্রতিক কমেন্টগুলি

ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ইন্নাল হামদা লিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়ানুছল্লি ‘আলা রসূলিহিল কারীম, আম্মাবাদ।
সম্মানিত পাঠক! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। অতঃপর আমরা মহান আল্লাহ তা‘য়ালার বান্দাহ যাদেরকে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা উত্তম কাঠামো দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন–
لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡۤ اَحۡسَنِ تَقۡوِیۡمٍ ۫﴿۴﴾
অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে। (সূরহ ত্বীন, আ: ৪)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ তা‘য়ালা মানুষকে কোনো পশু-পাখি, সাপ-বিচ্ছু কিংবা অন্য কোনো পোকা-মাকড়ের গঠনে সৃষ্টি করেননি; সৃষ্টি করেছেন সর্বোত্তম গঠনে, যাদের ঘাড় পশু-পাখির মতো সৃষ্টিগত ভাবেই সিজদা অবনত থাকে না। মানুষকে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা এমন স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, মানুষ ভালো-মন্দ বুঝে, সত্য-মিথ্যা বুঝে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট সিজদা অবনত করবে। এজন্য মহান আল্লাহ তা‘য়ালা মানুষকে ভালো-মন্দ বোঝার জ্ঞান দান করেছেন। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ نَفۡسٍ وَّ مَا سَوّٰىهَا ۪ۙ﴿۷﴾ فَاَلۡهَمَهَا فُجُوۡرَهَا وَ تَقۡوٰىهَا ۪ۙ﴿۸﴾
শপথ আত্মার এবং তার সুঠাম গঠনের। অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। (সূরহ আশ-শামস, আ: ৭-৮)
আর মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে এতো উত্তমভাবে এই জন্য সৃষ্টি করেছেন যে, আমরা যেন একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার ইবাদত করি। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ مَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَ الۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ ﴿۵۶﴾
আর মানুষ ও জ্বিনকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে। (সূরহ যারিয়াত, আ: ৫৬)
যেহেতু মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। অন্যান্য জন্তু-জানোয়ারের মতো কোন আকৃতিতে সৃষ্টি করেননি। সেহেতু আমাদের জন্যও একমাত্র কর্ম হলো অন্যান্য জন্তু-জানোয়ারের মতো জ্ঞানহীন ও কর্মহীন ভাবে জীবন অতিবাহিত না করে একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার ইবাদত করা। আর সেই ইবাদত আমাদের তৈরীকৃত মনগড়া ইবাদত করলে হবে না। নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে আল্লাহর ইবাদত করা যায় না।
আল্লাহর ইবাদত করতে হলে তাকে অবশ্যই আল্লাহর ইবাদত সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে। এবং তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য স্থির করতে হবে।
আর সেই জানা-বোঝা এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্থির করণের সহায়িকা হিসেবে একটি কিতাব রচনা করলাম। আমি তার নামকরণ করলাম-
“আমরা
কি চাই
কেন চাই
কিভাবে চাই”
আশা করি বইটি পড়ে পাঠকগণ উপকৃত হবেন, ইংশাআল্লাহ।
নিবেদক,
মাহমুদ বিন আব্দুল ক্বদীর
০৩/০১/২০২৬ ঈসায়ী
আমরা কি চাই, কেন চাই, কিভাবে চাই
অত্র কিতাবটি মূলত দুই ভাগে আলোচনা করা যায়। যথা-
[১] লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্থাৎ কি চাই, কেন চাই।
[২] কর্মপদ্ধতি অর্থাৎ কিভাবে চাই।
কিতাবটির প্রথম ভাগের আলোচনায় উল্লেখ করবো-
মুসলিম বান্দার কি চাওয়া উচিত বা তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিংবা তাদের চাওয়া কি অর্থাৎ আমরা কি চাই, কেন চাই।
কেননা, বান্দার পাওয়াটা হলো চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। বর্ণিত হাদিস-
আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘য়ালা বলেছেন- “আমার এবং আমার বান্দার মধ্যে ছলাতকে আমি দু’ভাগে বিভক্ত করেছি। আর আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে যা সে চায়। বান্দাহ ‘اَلۡحَمۡدُ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ তথা সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব’ বললে, আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। আর যখন সে ‘الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ অর্থাৎ যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু’ বলে, তখন আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমার গুণগান করেছে। আর যখন সে বলে ‘مٰلِكِ یَوۡمِ الدِّیۡنِ অর্থাৎ বিচার দিনের মালিক’, তখন আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমাকে সম্মানে ভূষিত করেছে। আর যখন সে বলে ‘اِیَّاكَ نَعۡبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسۡتَعِیۡنُ অর্থাৎ আমরা আপনারই ইবাদাত করছি এবং আপনারই নিকট সাহায্য চাই’, তখন আল্লাহ বলেন- এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে। আর আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে যা সে চায়। আর যখন সে বলে ‘اِهۡدِ نَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ صِرَاطَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمۡتَ عَلَیۡهِمۡ ۬ غَیۡرِ الۡمَغۡضُوۡبِ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا الضَّآلِّیۡنَ অর্থাৎ আমাদেরকে সরল পথ দেখান। দের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ। তাদের পথ নয়, যারা গজবপ্রাপ্ত (ইয়াহূদী) ও পথভ্রষ্ট (খ্রিস্টান)’, তখন আল্লাহ বলেন- এটা আমার বান্দার জন্য আর আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে যা সে চায়।” (সহিহ মুসলিম, হা: ৩৯৫)
অর্থাৎ কিছু পেতে হলে অবশ্যই বান্দার অন্তরে চাওয়া বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকতে হবে।
সুতরাং কিতাবটির প্রথম ভাগের চাওয়া বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথমে আলোচনা করবো, ইংশাআল্লাহ। কেননা লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন ব্যক্তিদের সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত আছে-
حَدَّثَنَا شَيْبَانُ بْنُ فَرُّوخَ، حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، – يَعْنِي ابْنَ حَازِمٍ – حَدَّثَنَا غَيْلاَنُ بْنُ، جَرِيرٍ عَنْ أَبِي قَيْسِ بْنِ رِيَاحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ “ مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ فَمَاتَ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً وَمَنْ قَاتَلَ تَحْتَ رَايَةٍ عُمِّيَّةٍ يَغْضَبُ لِعَصَبَةٍ أَوْ يَدْعُو إِلَى عَصَبَةٍ أَوْ يَنْصُرُ عَصَبَةً فَقُتِلَ فَقِتْلَةٌ جَاهِلِيَّةٌ وَمَنْ خَرَجَ عَلَى أُمَّتِي يَضْرِبُ بَرَّهَا وَفَاجِرَهَا وَلاَ يَتَحَاشَ مِنْ مُؤْمِنِهَا وَلاَ يَفِي لِذِي عَهْدٍ عَهْدَهُ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ ” .
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন- “যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে বেরিয়ে গেল এবং জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করল। আর যে ব্যক্তি লক্ষ্যহীন নেতৃত্বের পতাকাতলে যুদ্ধ করে, আসাবিয়াতের১ জন্য ত্রুদ্ধ হয় অথবা আসাবিয়াতের দিকে আহবান করে অথবা গোত্রের সাহায্যার্থে যুদ্ধ করে (আল্লাহর সন্তুষ্টির কোন ব্যাপার থাকে না), আর তাতে নিহত হয়। সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করে।” (ছহিহ মুসলিম, প্রশাসন ও নেতৃত্ব অধ্যায়, ই. ফা. হা নং: ৪৬৩৩, হা. একাডেমী নং: ৪৬৩৯)
১। আসাবিয়াত অর্থ হচ্ছে গোত্রপ্রীতি, দলপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, জাতীয়তাবাদ। যে ব্যক্তি আসাবিয়াতের দিকে লোকদেরকে আহ্বান করে, নিজে আসাবিয়াতের ওপর যুদ্ধ করে এবং এর ওপর মৃত্যুবরণ করে, সে ব্যক্তি আমাদের দলের নয় (মিশকাত ৪৬৮৮)। যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে সে যেন তার পিতার লিঙ্গ কামড়ে ধরে আছে। এবং একথা বলতে তোমরা যেন লজ্জাবোধ না করো (আদাবুল মুফরাদ ৯৬৩)। আরো বলা হয়েছে- আসাবিয়াত হলো তোমার গোত্রকে অন্যায় ব্যাপারে সাহায্য করা (মিশকাত ৪৬৮৬)।
আমাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য
লক্ষ্য:
আমাদের লক্ষ্য- আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে খিলাফাতিন আলা মিনহাজুন নুবুওয়্যাহ তথা নবুওয়াতের আদলে খিলাফাহ উপহার দেওয়া।
عَن النُّعْمَان بن بشير عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا اللَّهُ تَعَالَى ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا اللَّهُ تَعَالَى ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا عَاضًّا فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا اللَّهُ تَعَالَى ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا اللَّهُ تَعَالَى ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ نُبُوَّةٍ» ثُمَّ سَكَتَ قَالَ حَبِيبٌ: فَلَمَّا قَامَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ كَتَبْتُ إِلَيْهِ بِهَذَا الْحَدِيثِ أُذَكِّرُهُ إِيَّاهُ وَقُلْتُ: أَرْجُو أَنْ تَكُونَ أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ بَعْدَ الْمُلْكِ الْعَاضِّ وَالْجَبْرِيَّةِ فَسُرَّ بِهِ وَأَعْجَبَهُ يَعْنِي عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ.
হযরত নুমান ইবনু বাশীর (রা:), হুযায়ফা (রা:) হতে বর্ণনা করেন: রসূল ﷺ বলেছেন- “আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন তোমাদের মাঝে নবুওয়্যাত বিদ্যমান থাকবে। অতঃপর আল্লাহ নবুওয়্যাত উঠিয়ে নিবেন। অতঃপর আল্লাহ যতদিন চাইবেন ততদিন খিলাফাতিন আলা মিনহাজিন নুবুওয়্যাহ তথা নবুয়্যাতের আদলে খিলাফা থাকবে। অতঃপর এমন এক সময় আসবে তাও উঠিয়ে নেবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে ‘মুলকান আ‘দ্বোন’ তথা ধ্বংসকারী বাদশাহী। আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী তা যতদিন থাকার থাকবে, পরে তাকেও উঠিয়ে নেবেন। অতঃপর চেপে বসবে ‘মুলকান জাব্বারিইয়্যাহ’ তথা একনায়কত্ব, অপ্রতিরোধ্য রাজতন্ত্র। আল্লাহর ইচ্ছায় তা যতদিন থাকার থাকবে, পরে তাকেও তুলে নেবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে পুনরায় ‘নবুওয়্যাতের তরিকায় খিলাফাহ’ অর্থাৎ খিলাফাতিন ‘আলা মিনহাজিন নুবুওয়্যাহ। এ পর্যন্ত বলার পর রসূল ﷺ নীরব হলেন।” (মুসনাদে আহমাদ, হা: নং: ১৮৪৩০; সিলসিলাতুস সহীহাহ, হা: নং: ৫; মুসনাদে বাযযার, হা: নং: ২৭৯৬; আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা: নং: ৩৭২; মিশকাতুল মাসাবিহ, হা: নং: ৫৩৭৮, মান- সহিহ)
উদ্দেশ্য:
আমাদের উদ্দেশ্য- আমাদের সমস্ত ইবাদাত, ত্যাগ এবং যাবতীয় ভালো কর্ম এবং খিলাফাতিন আ‘লা মিনহাজিন নুবুওয়্যাহ প্রতিষ্ঠার জন্য সকল প্রচেষ্টা কেবলমাত্র মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টির জন্য।
মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
لَا خَیۡرَ فِیۡ كَثِیۡرٍ مِّنۡ نَّجۡوٰىهُمۡ اِلَّا مَنۡ اَمَرَ بِصَدَقَۃٍ اَوۡ مَعۡرُوۡفٍ اَوۡ اِصۡلَاحٍۭ بَیۡنَ النَّاسِ ؕ وَ مَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِكَ ابۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ اللّٰهِ فَسَوۡفَ نُؤۡتِیۡـهِ اَجۡرًا عَظِیۡمًا ﴿۱۱۴﴾
তাদের গোপন পরামর্শের অধিকাংশে কোন কল্যাণ নেই। তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় সাদকা কিংবা ভালো কাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার। আর যে তা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করবে; তবে অচিরেই আমি তাকে মহা পুরস্কার দান করবো। (সূরহ নিসা, আ: ১১৪)
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর রসূল ﷺ কে উদ্দেশ্যের শিক্ষা দিয়ে বলেন-
قُلۡ اِنَّ صَلَاتِیۡ وَ نُسُكِیۡ وَ مَحۡیَایَ وَ مَمَاتِیۡ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۶۲﴾ۙ
(হে নবী!) বল! নিশ্চয়ই আমার ছলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য। জিনি সকল কিছুর রব।” (সূরহ আনআম, আ: ১৬২)
অতএব আমাদের চাওয়ার বস্তু হলো দুটি। যথা-
[১] ইহকালীন চাওয়া।
[২] পরকালীন চাওয়া।
সংক্ষিপ্তভাবে যদি চাওয়ার কথা বলি। তাহলে,
(১) ইহকালীন চাওয়া হলো-
“আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ‘খিলাফাতের ভূমি’ উপহার দেওয়া।”
(২) পরকালীন চাওয়া হলো-
“মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করে পরকালীন জীবনে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নিয়ামতপূর্ণ জান্নাত লাভ করা।”
সুতরাং ‘আমরা কি চাই’ তা স্পষ্ট। আমরা চাই ইহকালীন জীবনে খিলাফাতের ভূমি। পরকালীন জীবনে আল্লাহর নিয়ামত পূর্ণ জান্নাত।
‘কেন চাই’ সেটাও স্পষ্ট। তা হলো মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قُلۡ اِنَّ صَلَاتِیۡ وَ نُسُكِیۡ وَ مَحۡیَایَ وَ مَمَاتِیۡ لِلّٰهِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۶۲﴾ۙ
“বলো! নিশ্চয়ই আমার ছলাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্যই, যিনি সকল কিছুর রব।” (সূরহ আনআম, আ: ১৬২)
আমাদের কর্মপদ্ধতি
এবার আলোচনার ২য় ভাগে কর্মপদ্ধতি অর্থাৎ কিভাবে চাই: সম্মানিত পাঠক! যেহেতু আমরা চাই দুনিয়ার জীবনে খিলাফাতের ভূমি এবং পরকালীন জীবনে জান্নাত। আর তা শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই চাই। সেহেতু আমাদের ‘কর্মপদ্ধতি বা পাওয়ার জন্য চাওয়া’ বাস্তবায়নের পদ্ধতিটা হতে হবে অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত এবং রসূল ﷺ এর প্রদর্শিত কর্মপদ্ধতি।
যদি আল্লাহর রসূল ﷺ এর দেখানো কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী খিলাফাতের ভূমি তৈরি ও জান্নাত লাভের প্রচেষ্টা না করা হয়। তবে হয়তো রাষ্ট্র সরকার হওয়া সম্ভব; কিন্তু খিলাফাতের ভূমি পাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো দুনিয়ার ভোগ–বিলাস পাওয়া সম্ভব; কিন্তু জান্নাত লাভ করা সম্ভব নয়। কেননা রসূল ﷺ এর দেখানো পথ বা কর্মপদ্ধতি ব্যতীত মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়।
সুতরাং আল্লাহর রসূল ﷺ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য, ইসলামের ভূমি তৈরির জন্য যেই কর্মপদ্ধতিগুলো বাস্তবায়ন করেছেন, যেই পথ প্রদর্শন করেছেন। সেই পথ দিয়েই আমাদেরকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। অন্যকোন পথ বা কর্মপদ্ধতি দিয়ে নয়। যেমন-
حَدَّثَنَا أَبُو سَعِيدٍ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعِيدٍ، حَدَّثَنَا أَبُو خَالِدٍ الأَحْمَرُ، قَالَ سَمِعْتُ مُجَالِدًا، يَذْكُرُ عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَخَطَّ خَطًّا وَخَطَّ خَطَّيْنِ عَنْ يَمِينِهِ وَخَطَّ خَطَّيْنِ عَنْ يَسَارِهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ فِي الْخَطِّ الأَوْسَطِ فَقَالَ ” هَذَا سَبِيلُ اللَّهِ ” . ثُمَّ تَلاَ هَذِهِ الآيَةَ (وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلاَ تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বলেন- “আল্লাহর রসূল ﷺ আমাদের সামনে মাটিতে একটি রেখা টানলেন। সে রেখার উপর হাত রেখে বললেন, এটি আল্লাহর পথ। অতঃপর সে রেখার ডানে ও বামে আরো অনেকগুলো রেখা অংকন করে বললেন, এসবগুলোই। তবে এসব পথের মাথায় একটি করে শয়তান দাঁড়িয়ে আছে। সে সর্বদা মানুষকে ঐ পথের দিকে আহবান করছে। এ কথা বলার পর আল্লাহর রসূল ﷺ কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেন- এটিই আমার সঠিক পথ। সুতরাং তোমরা এই সঠিক পথের অনুসরণ কর। অন্যান্য পথের অনুসরণ করোনা। তা নাহলে, সে সব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর সঠিক পথ হতে বিপদগামী করে দিবে।” (সূরহ আনআম, আ: ১৫৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, রসূলের সুন্নাতের অনুসরণ অধ্যায়, হা: নং: ১১; মুসনাদে আহমাদ, হা: নং: ১৪৮৫৩, মান-সহিহ)
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত-
حَدَّثَنَا مَحْمُودُ بْنُ غَيْلاَنَ، حَدَّثَنَا أَبُو دَاوُدَ الْحَفَرِيُّ، عَنْ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ زِيَادِ بْنِ أَنْعُمَ الإِفْرِيقِيِّ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ يَزِيدَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلاَنِيَةً لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي ” .
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা:) বলেন, “আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন-বনু ইসরাইলের যে অবস্থা এসেছিলো, আমার উম্মতরাও ঠিক তাদের অবস্থায় পতিত হবে। এমনকি তাদের কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়ে থাকে, তবে আমার উম্মতেরও কেউ তাতে লিপ্ত হবে। বনু ইসরাইলরা তো বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে। আর আমার উম্মতরা বিভক্ত হবে তিয়াত্তর দলে। এদের একটি দল ছাড়া সব দলই হবে জাহান্নামী। সাহাবীগণ (রা:) জিজ্ঞেস করলেন- হে আল্লাহর রসূল ﷺ! এটা কোন দল? তিনি বললেন- আমি এবং আমার সাহাবীরা যে পথের উপর প্রতিষ্ঠিত আছি (সেই পথ)”। (সুনানে তিরমিজি, ই.ফা. ২৬৪২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা: নং: ৪৪৪; মান- হাসান)
অর্থাৎ, অত্র হাদিস দুটি থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, সরল পথের পথচারীর সংখ্যা হবে খুবই কম। আর বিপদগামী বা বক্রপথের পথচারীদের সংখ্যা হবে অনেক। কেন না সরল পথটিই হলো জান্নাতের পথ। যে পথে পরিচালিত হতে অনেক কষ্ট ও বাঁধা রয়েছে। আর বিপথগামী বা বক্রপথটিই হলো জাহান্নামের পথ। যে পথে পরিচালিত হওয়ার জন্য রয়েছে শয়তান প্ররোচিত লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা, দুনিয়ার মোহ ইত্যাদি।
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَمْرٍو، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ الْجَنَّةَ قَالَ لِجِبْرِيلَ: اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ، فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا، ثُمَّ حَفَّهَا بِالْمَكَارِهِ، ثُمَّ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَدْخُلَهَا أَحَدٌ قَالَ: فَلَمَّا خَلَقَ اللَّهُ النَّارَ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَا يَسْمَعُ بِهَا أَحَدٌ فَيَدْخُلُهَا، فَحَفَّهَا بِالشَّهَوَاتِ ثُمَّ قَالَ: يَا جِبْرِيلُ اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَذَهَبَ فَنَظَرَ إِلَيْهَا، ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ وَعِزَّتِكَ لَقَدْ خَشِيتُ أَنْ لَا يَبْقَى أَحَدٌ إِلَّا دَخَلَهَا
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন- “মহান আল্লাহ জান্নাত তৈরি করে জিবরীল (আ:) কে আদেশ দিলেন, তুমি গিয়ে তা দেখে আসো। অতএব তিনি সেখানে গিয়ে তা দেখে এসে বললেন- হে রব! আপনার ইজ্জতের কসম! এটি সম্পর্কে যেই শুনবে, সে তাতে প্রবেশ না করে ছাড়বে না। অতঃপর তিনি জান্নাতকে কষ্টসাধ্য বিষয়সমূহ দ্বারা বেষ্টিত করে পুনরায় বললেন, হে জিবরীল! এবার আবার গিয়ে তা দেখে আসো। অতএব আবার গিয়ে দেখে এসে বললেন- হে রব! আপনার মর্যাদার কসম! আমার অত্যন্ত ভয় হচ্ছে যে, কেউই তাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আল্লাহর রসূল ﷺ বললেন- অতঃপর মহান আল্লাহ তা‘য়ালা জাহান্নাম তৈরি করে বললেন- হে জিবরীল! তুমি গিয়ে তা দেখে এসো। অতঃপর তিনি তা দেখে এসে বললেন- হে আমার রব! কেউই তাতে প্রবেশ করতে চাইবে না। অতঃপর আল্লাহ একে দুনিয়ার চাকচিক্য দিয়ে বেষ্টিত করে পুনরায় জিবরীল (আ:) কে বললেন- যাও তা দেখে এসো। তিনি সেখানে গিয়ে তা দেখে এসে বললেন- হে রব! আপনার মর্যাদার কসম! আমার ভয় হচ্ছে যে, কেউই অবশিষ্ট থাকবে না। সকলেই তাতে প্রবেশ করবে।” (সুনানে আবু দাউদ, হা: নং: ৪৭৪৪, মান-হাসান)
সরল পথে শয়তানের ফাঁদ
সম্মানিত পাঠক! সরল পথে শয়তানের ফাঁদ সম্পর্কে স্পষ্ট ভাবে জানার ও বোঝার জন্য কুরআন মাজিদ হতে ছোট্ট একটি ঘটনা উল্লেখ করবো, ইংশাআল্লাহ। যা মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বান্দার জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে কুরআন মাজিদে উল্লেখ করেছেন।
মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ لَقَدۡ خَلَقۡنٰكُمۡ ثُمَّ صَوَّرۡنٰكُمۡ ثُمَّ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِكَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ ٭فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ لَمۡ یَكُنۡ مِّنَ السّٰجِدِیۡنَ ﴿۱۱﴾
আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদের আকৃতি দিয়েছি। তারপর ফেরেস্তাদেরকে বলেছি- তোমরা আমাকে সিজদা কর। অতঃপর তারা সিজদা করেছে, ইবলীস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। (সূরহ আরাফ, আ: ১১)
১১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) বলেন- “আল্লাহ তা‘য়ালা যখন নিজ হাতে ঠনঠনে মাটি দ্বারা আদম (আ:) কে সৃষ্টি করলেন, তাকে একটা পূর্ণ মানবদেহের আকার দিলেন এবং তার মধ্যে রূহ সঞ্চার করলেন। তখন তিনি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যে আদমের সামনে সাজদা করতে ফেরেস্তাদের নির্দেশ দিলেন। ইবলিস ব্যতীত তারা সকলেই এ নির্দেশ শুনলো ও পালন করলো। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না।” (তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরহ আরাফ এর ১১ নং আয়াতের আলোচনা)
অতঃপর মহান আল্লাহ তা‘য়ালা যখন দেখলেন যে, ইবলীস ব্যতীত সকলেই আদম (আ:) কে সিজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সিজদা করে নি। তখন তিনি বললেন-
قَالَ مَا مَنَعَكَ اَلَّا تَسۡجُدَ اِذۡ اَمَرۡتُكَ ؕ قَالَ اَنَا خَیۡرٌ مِّنۡهُ ۚ خَلَقۡتَنِیۡ مِنۡ نَّارٍ وَّ خَلَقۡتَهٗ مِنۡ طِیۡنٍ ﴿۱۲﴾
“কিসে তোমাকে বাঁধা দিয়েছে যে, সিজদা করছো না; যখন আমি তোমাকে আদেশ দিয়েছি? সে বলল (অর্থাৎ শয়তান)- আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে।” (সূরহ আরাফ, আ: ১২)
১২ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) বলেন- “اَنَا خَیۡرٌ مِّنۡهُ অর্থ আমি তার থেকে শ্রেষ্ঠ। অভিশপ্ত শয়তানের এই উত্তর তার সিজদা না করার অপরাধের চেয়ে গুরুতর জঘন্য উত্তর।” মহান আল্লাহ তা‘য়ালাকে শয়তান বোঝাতে চাচ্ছে– ‘আমি যেহেতু আদম থেকে সম্মানে শ্রেষ্ঠ, তাই আমি কেন আদমকে সিজদা করতে যাবো?’ এই অচল যুক্তি দেখিয়ে শয়তান মহান আল্লাহ তা‘য়ালার আনুগত্য থেকে বিরত থাকলো। অভিশপ্ত শয়তানের যুক্তি ছিলো, সম্মানিত ব্যক্তিকে তার চেয়ে কম সম্মানিত লোককে সিজদা করার আদেশ দেয়া যায় না। ইবলীস বলছে- ‘আমি আদম থেকে উত্তম। তাহলে কিরূপে আপনি আদমকে সিজদা করার জন্য আমাকে আদেশ দিলেন?’ (নাউজুবিল্লাহ)
ইবলীস মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সামনে তার অচল যুক্তি উপস্থাপন করে শুধু প্রশ্নই ছুঁড়ে দেয়নি বরং আদমের উপর তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণও উল্লেখ করেছে, যা তার নিকৃষ্ট ব্যবহার। শয়তান মহান আল্লাহ তা‘য়ালাকে বলছে-‘আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আদমকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর মাটির চেয়ে আগুন উত্তম।’
অর্থাৎ, অভিশপ্ত ইবলীস সৃষ্টির মৌল উপাদানের প্রতি দৃষ্টি দিলো, কিন্তু সে হযরত আদম (আ:) এর বিশাল সম্মানের দিকে দেখলো না। আদমকে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা নিজ হাতে তৈরি করেছেন এবং তার মাঝে রূহ সঞ্চার করে তাকে কত সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছেন। তারপরেও শয়তান মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সুস্পষ্ট আয়াত- “ফাকোয়ু লাহু সা-জিদীন অর্থ তোমরা সবাই তার জন্য সিজদায় লুটিয়ে পড়বে”, এর বিরুদ্ধে অচল যুক্তি দাঁড় করালো। ফলে সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ ও ফেরেস্তাদের সঙ্গ থেকে বহিস্কৃত হলো। আর ইবলীস শব্দের অর্থ হলো নিরাশ।
ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) আরো বলেন- “অভিশপ্ত শয়তানের পেশকৃত যুক্তিটি বাস্তবতার বিবেচনায়ও অচল। কারণ মাটির ধৈর্য্য, স্থিরতা, দৃঢ়তা ইত্যাদি গুণ রয়েছে। এছাড়াও এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন, পরিবর্ধন ও সংশোধনের গুণ। পক্ষান্তরে আগুনের মধ্যে প্রজ্বলন, ধ্বংস, ক্রোধ ও অস্থিরতার দোষ রয়েছে। তাই দেখা গেছে ইবলীসের উপাদান আগুন ও তার বৈশিষ্ট্য সমূহ তাকে প্রতারিত করেছে, মহান আল্লাহ তা‘য়ালার অবাধ্য করেছে এবং গজবে তাকে পতিত করেছে। অপরপক্ষে আদমের মূল উপাদান মাটি ও তার বৈশিষ্ট্য সমূহ তাকে উপকৃত করেছে।
তিনি আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তনকারী, বিনয়ী, ত্রুটি স্বীকারকারী, ক্ষমা প্রার্থনাকারী ও আত্মসমর্পণকারী হয়েছেন। ইবনে সীরীন (রহি:) বলেন-‘সর্বপ্রথম ইবলীস যুক্তি দাঁড় করেছে এবং এরূপ যুক্তির মাধ্যমেই চন্দ্র-সূর্যের পূজা চালু হয়েছে।’
অভিশপ্ত শয়তান নিজের অপরাধ স্বীকার না করে আরো নিজের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করেছে এবং অহংকারবশত মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। সে বলেছে- আমি আদম থেকে শ্রেষ্ঠ, তাহলে আপনি কিরূপে আদমকে সিজদা করার জন্য আমাকে আদেশ দিলেন?
এবং শয়তান তার শ্রেষ্ঠত্বের দাবীর স্বপক্ষে অচল যুক্তি মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সামনে উপস্থাপন করেছে, বলেছে- আমি আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি।
অভিশপ্ত শয়তানের এই নিকৃষ্ট ব্যবহারের কারণে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قَالَ فَاهۡبِطۡ مِنۡهَا فَمَا یَكُوۡنُ لَكَ اَنۡ تَتَكَبَّرَ فِیۡهَا فَاخۡرُجۡ اِنَّكَ مِنَ الصّٰغِرِیۡنَ ﴿۱۳﴾ قَالَ اَنۡظِرۡنِیۡۤ اِلٰی یَوۡمِ یُبۡعَثُوۡنَ ﴿۱۴﴾ قَالَ اِنَّكَ مِنَ الۡمُنۡظَرِیۡنَ ﴿۱۵﴾
“সুতরাং তুমি এখান থেকে নেমে যাও। তোমার এ অধিকার নেই যে, এখানে তুমি অহংকার করবে। সুতরাং তুমি বের হও। নিশ্চয়ই তুমি লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত। সে বলল- সেদিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন, যেইদিন তাদেরকে পুনরায় জীবিত করা হবে। আল্লাহ বললেন- নিশ্চয়ই তুমি অবকাশ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরহ আরাফ, আ: ১৩-১৫)
ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) বলেন- ইবলিশের কর্ম তার জন্য তার আশার বিপরীত ফল বয়ে আনলো। অভিশপ্ত হওয়ার পর ইবলীস প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করার কথা চিন্তা করলো এবং আল্লাহ তা‘য়ালার কাছে প্রতিদান দিবস পর্যন্ত সময় প্রার্থনা করে বলল- ‘اَنۡظِرۡنِیۡۤ اِلٰی یَوۡمِ یُبۡعَثُوۡنَ’ অর্থ আমাকে পুনরুজ্জীবিত দিবস পর্যন্ত অবকাশ বা সুযোগ দিন। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা তার প্রার্থনার জবাবে বললেন- ‘اِنَّكَ مِنَ الۡمُنۡظَرِیۡنَ’ অর্থ অবশ্যই তুমি অবকাশ বা সুযোগ লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত।
অতঃপর ইবলীস যখন খুব আশ্বস্ত হলো তার অবকাশের ব্যাপারে যে তাকে অবকাশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর সে অহংকার ও বিরোধিতার স্বভাবে জাগ্রত হয়ে গেল। অতঃপর শয়তান বলল-
قَالَ فَبِمَاۤ اَغۡوَیۡتَنِیۡ لَاَقۡعُدَنَّ لَهُمۡ صِرَاطَكَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ﴿ۙ۱۶﴾ ثُمَّ لَاٰتِیَنَّهُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مِنۡ خَلۡفِهِمۡ وَ عَنۡ اَیۡمَانِهِمۡ وَ عَنۡ شَمَآئِلِهِمۡ وَ لَا تَجِدُ اَكۡثَرَهُمۡ شٰكِرِیۡنَ ﴿۱۷﴾
“আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার ‘সরল পথে’ বসে থাকবো। তারপর পথভ্রষ্ট করার জন্য আমি অবশ্যই তাদের নিকট আসবো তাদের সামনে থেকে ও তাদের পিছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।” (সূরহ আরাফ, আ:১৬-১৭)
১৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) একটি হাদিস উল্লেখ করেন-
أَخْبَرَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ يَعْقُوبَ قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو النَّضْرِ هَاشِمُ بْنُ الْقَاسِمِ قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَقِيلٍ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَقِيلٍ قَالَ حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ الْمُسَيَّبِ عَنْ سَالِمِ بْنِ أَبِي الْجَعْدِ عَنْ سَبْرَةَ بْنِ أَبِي فَاكِهٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ إِنَّ الشَّيْطَانَ قَعَدَ لِابْنِ آدَمَ بِأَطْرُقِهِ فَقَعَدَ لَهُ بِطَرِيقِ الْإِسْلَامِ فَقَالَ تُسْلِمُ وَتَذَرُ دِينَكَ وَدِينَ آبَائِكَ وَآبَاءِ أَبِيكَ فَعَصَاهُ فَأَسْلَمَ ثُمَّ قَعَدَ لَهُ بِطَرِيقِ الْهِجْرَةِ فَقَالَ تُهَاجِرُ وَتَدَعُ أَرْضَكَ وَسَمَاءَكَ وَإِنَّمَا مَثَلُ الْمُهَاجِرِ كَمَثَلِ الْفَرَسِ فِي الطِّوَلِ فَعَصَاهُ فَهَاجَرَ ثُمَّ قَعَدَ لَهُ بِطَرِيقِ الْجِهَادِ فَقَالَ تُجَاهِدُ فَهُوَ جَهْدُ النَّفْسِ وَالْمَالِ فَتُقَاتِلُ فَتُقْتَلُ فَتُنْكَحُ الْمَرْأَةُ وَيُقْسَمُ الْمَالُ فَعَصَاهُ فَجَاهَدَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ قُتِلَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ وَإِنْ غَرِقَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ أَوْ وَقَصَتْهُ دَابَّتُهُ كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ
হযরত সাবরহ ইবনে আবু ফাকিহ (রা:) বলেন- আমি আল্লাহর রসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি- শয়তান আদম সন্তানের পথসমূহে বসে থাকে। সে ইসলামের পথে বাঁধা সৃষ্টি করতে গিয়ে বলে- তুমি ইসলাম গ্রহণ করবে? আর তোমার দ্বীন ও তোমার বাপ দাদার দ্বীন এবং তোমার পিতার পূর্বপুরুষের দ্বীন পরিত্যাগ করবে? কিন্তু আদম সন্তান তার কথা অমান্য করে ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর শয়তান তার হিজরতের পথে বসে বলে-তুমি হিজরত করবে? তোমার ভূমি ও আকাশ পরিত্যাগ করবে? মুহাজির তো একটি রশিতে আবদ্ধ ঘোড়ার ন্যায়। কিন্তু সেই ব্যক্তি শয়তানের কথা অমান্য করে হিজরত করে। এরপর শয়তান তার জিহাদের পথে বসে এবং বলে- তুমি কি জিহাদ করবে? এতো নিজেকে এবং নিজের ধন-সম্পদকে ধ্বংস করা। তুমি যুদ্ধ করে নিহত হবে, তোমার স্ত্রী অন্যের সাথে বিবাহে যাবে, তোমার সম্পদ ভাগ হবে। সে ব্যক্তি শয়তানের কথা অমান্য করে জিহাদে যায়। আল্লাহর রসূল ﷺ বলেন- যে এরূপ করবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী তার জন্য অবধারিত। আর যে ব্যক্তি শহীদ হয়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর উপর অবধারিত হয়। যদি সে ডুবে মারা যায়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর উপর অবধারিত হয়। আর যদি তার বাহন তাকে ফেলে দিয়ে তার গর্দান ভেঙ্গে দেয় বা মেরে ফেলে, তখনও তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর উপর অবধারিত হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরহ আরাফ, ১৬ নং আয়াতের আলেচনা; সুনানে নাসাঈ, হা: নং: ৩১৩৮; ছহিহুল জামে, হা: নং: ১৪৬৫, মান- সহিহ)
১৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) উল্লেখ করেন- হযরত আলী ইবনে আবু তালহা (রহি:) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা:) বলেছেন- (শয়তান বলে) ‘ثُمَّ لَاٰتِیَنَّهُمۡ مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡهِمۡ’, অর্থ আখিরাত সম্পর্কে তাদের অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করবো; ‘وَ مِنۡ خَلۡفِهِمۡ’ অর্থ তাদের পিছন দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ চালাবো, অর্থাৎ পার্থিব বিষয়ে তাদের মনে লোভ বা আকর্ষণ সৃষ্টি করবো; ‘وَ عَنۡ اَیۡمَانِهِمۡ’ অর্থ তাদের ডান দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ চালাবো অর্থাৎ দ্বীনী বিষয়ে তাদের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলবো; ‘وَ عَنۡ شَمَآئِلِهِمۡ’ অর্থ তাদের বাম দিক থেকে তাদের উপর আক্রমণ চালাবো, অর্থাৎ গুনাহের কাজকে তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখাবো।
হযরত কাতাদা (রা:) বলেছেন- ‘مِّنۡۢ بَیۡنِ اَیۡدِیۡهِمۡ’, ইবলিস তাদের সম্মুখ দিক থেকে তাদের উপর হামলা চালায়। অর্থাৎ তাকে বলে- পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি বলে কিছু নেই। ‘وَ مِنۡ خَلۡفِهِمۡ’, তাদের পিছন দিক থেকে তাদের উপর হামলা চালায়, অর্থাৎ পার্থিব বিষয়কে তাদের সামনে সুশোভিত করে তুলে ধরে তাদের সেদিকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করে। ‘وَ عَنۡ اَیۡمَانِهِمۡ’, তাদের ডান দিক থেকে তাদের উপর হামলা চালায়, অর্থাৎ সৎকর্মসমূহ থেকে তাদের বিরত রাখতে চেষ্টা করে। ‘وَ عَنۡ شَمَآئِلِهِمۡ’, তাদের বাম দিক থেকে তাদের উপর হামলা চালায়, অর্থাৎ গুনাহের কাজসমূহকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে দেখায়, সেগুলো কার্যকর করতে তাদেরকে আহবান করে, নির্দেশ দেয়।
হে আদম সন্তান! ইবলীস তোমাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করতে সামর্থ্য হলেও তেমার উর্ধ্ব দিক থেকে তোমার কাছে আসতে পারবে না। ওই দিক থেকে তোমাদের উপর আল্লাহ তা‘য়ালার রহমত নাযিল হয়; ইবলীস আল্লাহর রহমত ও তাঁর বান্দার মধ্যে এসে অন্তরায় হওয়ার সুযোগ পায় না।
হযরত হাকাম ইবনে আবান (রহি:) বলেন- “ইবনে আব্বাস (রা:) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন- ইবলীস তাদের সম্মুখ দিক থেকে, তাদের পিছন দিক থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে আক্রমণ করবে বলা হয়েছে; কিন্তু সে উর্ধ্ব দিক থেকে তাদের কাছে আসবে বলা হয় নি। কারণ উর্ধ্বদিক থেকে বান্দার প্রতি রহমতই নাযিল হয়ে থাকে।”(তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরহ আরাফ, ১৭নং আয়াতের আলোচনা)
ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) উল্লেখ করেছেন- হযরত আলী ইবনে আবু তালহা (রহি:) বলেন, ইবনে আব্বাস (রা:) বলেছেন- ‘وَ لَا تَجِدُ اَكۡثَرَهُمۡ شٰكِرِیۡنَ’ আর তুমি তাদের অধিকাংশকেই অকৃতজ্ঞ অর্থাৎ তাওহীদপন্থী পাবে না। অতএব, তাওহীদ পন্থীরা মহান আল্লাহ তা‘য়ালার প্রকৃত কৃতজ্ঞতা স্বীকারকারী। যাদের সংখ্যা অকৃতজ্ঞের তুলনায় অনেক কম।
অতঃপর অভিশপ্ত ইবলীস যখনই আল্লাহর নাফরমানি করলো এবং আদম সন্তানকে পথভ্রষ্ট করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলো। তখন আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قَالَ اخۡرُجۡ مِنۡهَا مَذۡءُوۡمًا مَّدۡحُوۡرًا ؕ لَمَنۡ تَبِعَكَ مِنۡهُمۡ لَاَمۡلَـَٔنَّ جَهَنَّمَ مِنۡكُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ﴿۱۸﴾
তুই এখান থেকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় বের হয়ে যা, তাদের (বানী আদমের) মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে, নিশ্চয়ই আমি তোদের সকলের দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব। (সূরহ আরাফ, আ: ১৮)
১৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) অত্র তিনটি আয়াত তুলে ধরেন, যেখানে মহান আল্লাহ বলেন-
قَالَ اذۡهَبۡ فَمَنۡ تَبِعَكَ مِنۡهُمۡ فَاِنَّ جَهَنَّمَ جَزَآؤُكُمۡ جَزَآءً مَّوۡفُوۡرًا ﴿۶۳﴾ وَ اسۡتَفۡزِزۡ مَنِ اسۡتَطَعۡتَ مِنۡهُمۡ بِصَوۡتِكَ وَ اَجۡلِبۡ عَلَیۡهِمۡ بِخَیۡلِكَ وَ رَجِلِكَ وَ شَارِكۡهُمۡ فِی الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَوۡلَادِ وَ عِدۡهُمۡ ؕ وَ مَا یَعِدُهُمُ الشَّیۡطٰنُ اِلَّا غُرُوۡرًا ﴿۶۴﴾ اِنَّ عِبَادِیۡ لَیۡسَ لَكَ عَلَیۡهِمۡ سُلۡطٰنٌ ؕ وَ كَفٰی بِرَبِّكَ وَكِیۡلًا ﴿۶۵﴾
যাও (দূর হয়ে যাও এখান থেকে, তাদের মধ্যে), যারা তোমার অনুসরণ করবে, তোমাদের সবার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম, আর (জাহান্নামের) শাস্তিও পুরোপুরি দেয়া হবে। এদের মধ্যে যাকেই পারো তুমি তোমার আওয়ায দিয়ে গোমরাহ করে যাও। তোমার যাবতীয় অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ো, তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্তানাদিতে তুমি অংশীদার হয়ে যাও এবং (যতো পারো) তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে থাকো। আর শয়তান তাদের যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না। নিঃসন্দেহে যারা আমার খাস বান্দা তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা চলবে না। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার রবই যথেষ্ট। (সূরহ বনি ইসরাইল, আ: ৬৩-৬৫)
জানা প্রয়োজন:
সম্মানিত পাঠক! ‘সরল পথে শয়তানের ফাঁদ’ অধ্যায়ের সূরহ আরাফের ১১-১৮ নং আয়াতের আলোচনা থেকে জ্ঞানবান ব্যক্তিদের জন্য অনেক কিছু জানার আছে, বোঝার আছে। কাজেই আমি এই কিতাবের ‘জানা প্রয়োজন’ শিরোনামে সূরহ আরাফের ১১-১৮ নং আয়াতের আলোচনা থেকে সার্বক্ষনিক চলমান শিক্ষনীয় বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করবো, ইংশাআল্লাহ।
১১ নং আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়-
(১) শয়তান যে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু এ কথা মহান আল্লাহ তা‘য়ালা কুরআন মাজিদে কয়েক জায়গায় উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ قُلۡ لِّعِبَادِیۡ یَقُوۡلُوا الَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ یَنۡزَغُ بَیۡنَهُمۡ ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ كَانَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوًّا مُّبِیۡنًا ﴿۵۳﴾
“আর আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন এমন কথা বলে, যা অতি সুন্দর। নিশ্চয়ই শয়তান তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরহ বনি ইসরাইল, আ: ৫৩)
আল্লাহ বলেন-
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ كُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۱۶۸﴾
“হে মানুষ! জমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল-পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পথ অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরহ বাকারহ, আ: ১৬৮)
আল্লাহ আরো বলেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ كَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۲۰۸﴾
“হে মুমিনগণ! তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পথ অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরহ বাকারহ, আ: ২০৮)
আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قَالَ یٰبُنَیَّ لَا تَقۡصُصۡ رُءۡیَاكَ عَلٰۤی اِخۡوَتِكَ فَیَكِیۡدُوۡا لَكَ كَیۡدًا ؕ اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لِلۡاِنۡسَانِ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ ﴿۵﴾
“সে বলল (অর্থাৎ ইয়াকুব বলল)- হে আমার পুত্র, তুমি তোমার ভাইদের নিকট তোমার স্বপ্নের কথা বলিও না। তাহলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরহ ইউসুফ, আ: ৫)
তবুও মানুষ লোভে পড়ে অথবা অজ্ঞতার কারণে অথবা অধিক উদারতা দেখিয়ে অথবা হিংসায় জর্জরিত হয়ে, সেই প্রকাশ্য শত্রু শয়তানের পথই অনুসরণ করে। যদিও মানুষের স্রষ্টা, মানুষের অভিভাবক মহান আল্লাহ তা‘য়ালা সেই শয়তানের পথ অনুসরণ করতে মানুষকে নিষেধ করেছেন।
(২) কেন ও কখন থেকে শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু হয়েছে, সেটাও অত্র আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়েছে। আর তা হলো- যখন আল্লাহ তা‘য়ালা মানবজাতির পিতা আদম (আ:) অর্থাৎ আবুল বাশার আদম (আ:) কে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সম্মানিত করেছেন। তখন শয়তান আদম (আ:) এর এই সম্মানকে অস্বীকার করেছে এবং তা প্রকাশ্যে। সুতরাং অভিশপ্ত ইবলীস আমাদের পিতা আদম (আ:) এর সম্মানকে সহ্য করতে পারে নাই। সে জন্যই সে মহান আল্লাহর নাফরমানী করেছে এবং প্রকাশ্যে আমাদের পিতা হযরত আদম (আ:) এর বিরোধিতা করেছে।
অতএব, যে মানবজাতির পিতার প্রকাশ্য শত্রু, সে গোটা মানবজাতির কল্যাণ কামনা করে না। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা এই অভিশপ্ত শয়তান হতে আমাদের হেফাজত করুন, আমিন।
(৩) মানবজাতির সম্মান রক্ষার্থেই মহান আল্লাহ তা‘য়ালা শয়তানকে অভিশপ্ত করেছেন। আর মানবজাতির মূর্খ শ্রেণীর লোকেরাই শয়তানকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছে এবং শয়তানের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে হাটছে। হায় আফসোস! এই মূর্খ শ্রেণীর অকৃতজ্ঞ মানুষদের জন্য, যারা শয়তানের ইচ্ছাপূরণের চেষ্টা করে।
(৪) অভিশপ্ত শয়তানই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার আদেশ অমান্য করে। সুতরাং মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি আল্লাহর আদেশ অমান্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে।
১২ নং আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়-
(১) শয়তান যখন আল্লাহ তা‘য়ালার আদেশ অমান্য করলো এবং আদম (আ:) এর সম্মানকে অস্বীকার করলো, তখন মহান আল্লাহ তা‘য়ালা অভিশপ্ত শয়তানের নিজ মুখ হতে স্বীকারোক্তি বা জবানবন্দি নিতে চাইলেন। শয়তানকে বললেন- ‘কিসে তোমাকে বাঁধা দিয়েছে যে সিজদা করছো না, যখন আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছি!’ শয়তান তার জবানবন্দীতে বলল- ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে।’
শয়তান তার বড় বড় দুইটি অপরাধ- (১) আল্লাহর আদেশ অমান্য করা, (২) আদম (আ:) এর সম্মানকে অস্বীকার করা। এই দুইটি অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা তো করলোই না বরং সে তার অহংকার প্রকাশ করলো এবং তার এই অহংকার বশত শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের অচল যুক্তি উপস্থাপন করলো।
(২) সর্বপ্রথম অভিশপ্ত শয়তান অহংকার করেছিলো এবং নিজেই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করছিলো তার অভিভাবকের সামনে।
(৩) অভিশপ্ত শয়তানই প্রথম সত্যের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলো, যা বাস্তব দৃষ্টিতে খুবই অচলযুক্তি। সুতরাং সত্যের সামনে যারা যুক্তি দাড় করতে চায় এবং অহংকার বসত নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। তাদের অচল যুক্তির রোষানলে তারা নিজেরাই পতিত হয়।
১৩ নং আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়-
(১) অহংকরাকারীদেরকে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা পছন্দ করেন না।
(২) অহংকারকারী বেশি সময় ইসলামের মধ্যে থাকতে পারে না। কেন না মহান আল্লাহ তা‘য়ালাই অহংকারকারীকে বের করে দেন।
(৩) অহংকার লাঞ্ছিত হওয়ার মূল কারণ।
(৪) অহংকারীর অহংকার তার চেহারাতে আগুনের ন্যায় ফুটে থাকে। ফলে অহংকারীর ব্যবহার, কথা-বার্তা শুনলেই খুব সহজেই চেনা যায়। আর জ্ঞানবান ব্যক্তিদের জন্য উচিত অহংকারীকে চিহ্নিত করা এবং তার থেকে দূরে থাকা। তা ব্যতীত জ্ঞানবান ব্যক্তিও মূর্খের মতো অহংকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
১৬ নং আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়-
(১) শয়তান যখন বুঝতে পারলো যে তাকে আর ফেরেস্তাদের জামায়াতে রাখা হবে না অর্থাৎ ফেরেস্তাদের জামায়াত হতে যখন তাকে বের করে দেওয়া হলো, তখন সে আল্লাহর নিকট থেকে একটি সুযোগ চেয়ে নিলো। যখন আল্লাহ তা‘য়ালা তাকে সুযোগ দিলো, তখন অভিশপ্ত শয়তান আরো অহংকার ও বিরোধিতার স্বভাবে জাগ্রত হয়ে উঠলো। অর্থাৎ যারা শয়তানের অনুসারী তাদেরকে যখন সত্য পথের জামায়াত থেকে বের করে দেওয়া হয় অথবা তাদের কর্মদোষে বের হয়ে যায় তখন সে আরো অহংকারী হয়ে যায় এবং সত্য পথের জামাআতের বিরোধিতায় সে আরো জাগ্রত হয়ে উঠে। অর্থাৎ তার হিংসা-বিদ্বেষ, আর বিরোধিতা আরো চরম পর্যায়ে পৌছে যায়। এবং সে বা তারা মানুষকে ইসলামের পথে বাঁধা প্রদান করে। যেমনভাবে তাদের পরিচালক শয়তান ইসলামের পথে বাঁধা দান করে।
১৬ নং আয়াতের আলোচনায় হযরত সাবরাহ (রা:) এর বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে, যখন কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করতে চায় বা সত্য পথের জামাআতে যুক্ত হতে চায় তখন শয়তান তাকে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে যে তুমি ইসলাম গ্রহণ করবে? আর তোমার দ্বীন ও তোমার বাপ-দাদার দ্বীন এবং তোমার পিতার পূর্বপুরুষদের দ্বীন পরিত্যাগ করবে?
আর বর্তমানে শয়তানের অনুসারীরা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয় শয়তানের পক্ষ হয়ে। তারা বলে- তোমরা সে দলে যাবে অর্থাৎ সত্যের পথের জামায়াতে যুক্ত হবে? এটা তো বিপদজনক পথ। তোমাকে পুলিশে গ্রেফতার করবে, তুমি বিপদে পড়বে ইত্যাদি।
যখন শয়তান ও তার অনুসারীদের কুমন্ত্রণাকে তারা উপেক্ষা করে সত্যকে গ্রহণ করে, তখন সত্য পথের অনুসারীদের কাজ থাকে ইসলামের ভূমি তৈরির জন্য, নিজের ও জাতির ঈমান আমল হেফাজতের জন্য হিজরত করা।
অতঃপর শয়তান তাকে বলে- তুমি হিজরত করবে? তোমার ভূমি ও আকাশ পরিত্যাগ করবে? যারা হিজরত করে, তাদের অবস্থা তো একটি রশিতে আবদ্ধ ঘোড়ার ন্যায়। অর্থাৎ তোমার জন্য দুনিয়াটা সংকীর্ণ হয়ে যাবে, সবার থেকে বিছিন্ন হয়ে যাবে।
আর বর্তমানে শয়তানের অনুসারীরা মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়, একথা বলে যে- তুমি তোমার বাপ-দাদার ভূমি বা জমি রেখে বা বিক্রয় করে হিজরতে যেতে চাচ্ছো? তুমিও বিপদে পড়বে তাদের মতো যারা ইতিপূর্বে বিপদে পড়েছে। এই পথে হিজরত করে শত শত মানুষ নিঃশেষ হয়ে গেছে। তোমাদের জায়গা-জমি, টাকা-পয়সা সব তারা আত্মসাৎ করবে। কিছু দিন থামো। তোমরা দেখ, তারা (সত্য পথের অনুসারীরা) ধ্বংস হয়ে যায় নাকি টিকে থাকে ইত্যাদি। যখন সত্য পথের অনুসারীগণ শয়তান ও তার অনুসারীদের কুমন্ত্রণা উপেক্ষা করে হিজরতের নিয়তের উপর দৃঢ় থাকে, তখন শয়তান বলে- তুমি কি জিহাদ করবে? এতো নিজেকে এবং নিজের সম্পর্ককে ধ্বংস করা। তুমি যুদ্ধ করে নিহত হবে, তোমার স্ত্রীর অন্যের সাথে বিবাহ হবে, তোমার সম্পদ ভাগ হয়ে যাবে ইত্যাদি।
বর্তমানেও এইরূপভাবে শয়তানের অনুসারীরা সত্য পথের অনুসারীগণকেও জিহাদ সম্পর্কে অন্তরে ভয় ঢুকাতে চেষ্টা করে। আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন- “যারা শয়তানের এই কুমন্ত্রণাগুলোকে উপেক্ষা করে সত্যকে সত্য বলে গ্রহণ করবে, সত্যের পথে দৃঢ় অবিচল থাকবে। তারা যেভাবেই মৃত্যুবরণ করুক না কেন, তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত হয়।”
(২) ১৬ নং আয়াতের আলোচনায় বর্ণিত হাদিসটিতে এটাও স্পষ্ট হয় যে, সত্য পথ সেটাই যেই পথে হিজরত ও জিহাদ রয়েছে এবং তাতে শয়তান ও তার অনুসারীদের পক্ষ হতে কুমন্ত্রণা ও বাঁধা আছে। এ প্রসঙ্গে আরো একটি হাদিস রয়েছে-
عَن الحارِثِ الْأَشْعَرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ: بِالْجَمَاعَةِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَالْهِجْرَةِ وَالْجِهَادِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَإِنَّهُ مَنْ خَرَجَ مِنَ الْجَمَاعَةِ قِيدَ شِبْرٍ فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ إِلَّا أَنْ يُرَاجِعَ وَمَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ فَهُوَ مِنْ جُثَى جَهَنَّمَ وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ . رَوَاهُ أَحْمد وَالتِّرْمِذِيّ
হযরত হারিস আল–আশ‘আরী (রা:) বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন- আমি তোমাদেরকে ৫টি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি। (১) জাময়াত বদ্ধ থাকবে, (২) আমীরের নির্দেশ শ্রবণ করবে, (৩) তার আনুগত্য করবে, (৪) [প্রয়োজনে] হিজরত করবে, (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। যে ব্যক্তি এই জামায়াত থেকে এক বিঘত পরিমাণ বের হয়ে গেল, তার গর্দান হতে ইসলামের গন্ডি ছিন্ন হয়ে গেল। (অর্থাৎ সে জাহিলিয়াতে প্রবেশ করলো)। যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। যে ব্যক্তি মানুষকে (জামায়াত ছিন্ন হওয়ার দিকে) অর্থাৎ জাহিলিয়াতের দিকে আহবান করলো, সে ব্যক্তি জাহান্নামীদের দলভুক্ত হলো। যদিও সে সিয়াম পালন করে, ছলাত আদায় করে ও ধারণা করে যে, সে একজন মুসলিম। (সুনানে তিরমিজি, হা: নং: ২৮৬৩; মুসনাদে আহমাদ, হা: নং: ১৭২০৯; মিশকাত, হা: নং: ৩৬৯৪, মান-সহীহ)
১৭ নং আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়-
(১) শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। ১৭ নং আয়াতে শয়তান নিজেই ঘোষণা দিয়েছে এবং শুধু শত্রুতা না, বরং সরল পথের অনুসারীদেরকে সে আক্রমণের হুমকি দিয়েছে। মানুষকে সত্য পথ থেকে বিপদগামী করার জন্য সে সকল প্রকার ষড়যন্ত্র করার শপথ করেছে। শয়তান বলেছে- সে মানুষকে সম্মুখ থেকে আক্রমণ করবে অর্থাৎ মানুষকে পরকাল সম্পর্কে, দ্বীনিকর্ম সম্পর্কে, সত্য পথ সম্পর্কে সন্দেহে পতিত করবে। কারণ দ্বীনের পথে এই সন্দেহ সৃষ্টি করাটাই অধিক নিকৃষ্ট কাজ। যেমন কিতাবুয যুহদে এক আছার এসেছে-
قِيلَ لِبَعْضِ الصَّحَابَةِ: أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ؟ قَالَ: الْكُفْرُ بِاللَّهِ. قِيلَ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: الشَّكُّ.
এক সাহাবীকে সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন– কুফরি, অতঃপর কোনটি জিজ্ঞেস করলে বলেন- সন্দেহ। (সাহাবিদের চোখে দুনিয়া, আহমাদ বিন হাম্বল (রহি.), পৃষ্ঠা: ১৩)
আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন:
“ دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لاَ يَرِيبُكَ فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةٌ ”
“তুমি ঐ জিনিস পরিত্যাগ কর, যে জিনিস তোমাকে সন্দেহে ফেলে এবং তা গ্রহণ কর যাতে তোমার সন্দেহ নেই। কারণ সত্য হল মনের শান্তি ও স্থিরতা এবং মিথ্যা হল অস্থিরতা ও সন্দেহ” (তিরমিযী ২৫১৮; নাসায়ী ৫৭১১; আহমাদ ২৭৮১৯; দারেমী ২৫৩২)
তিনি আরো ﷺ বলেছেন,
إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ
“সাবধান! তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, অনুমান হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা।” (বুখারি ইসঃ ফাঃ ৫৬৪০; মুসলিম ২৫৬৩)
আর শয়তান ও তার অনুসারীদের কাজই হলো মানুষের মনে সত্যের বিপরীতে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়া। তারপর সে বলেছে, মানুষকে সে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করবে। অর্থাৎ তাকে দুনিয়ার যতো প্রকার লোভ-লালসা দেখানো যায়, শয়তান ও তার অনুসারীরা তা সত্যপথের অনুসারীদেরকে দেখাবে। তবুও যে ভাবেই হোক তারা মানুষকে সত্য পথ থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করেই যাবে। এতে শয়তানের অনুসারীরা তাদের নিজেদের ঈমান নিয়েও ভয় পায় না। তারা নিজেদের মুখে নিজেকে হেদায়েতপ্রাপ্ত বলে পরিচয় দেবে ঠিকই, কিন্তু তারাই আবার তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থী হয়, তাগুতের কাছে মামলা দেয়, তারাই আবার তাগুতের নিয়ম-কানুন বাস্তবায়নের কাজে লিপ্ত হয়।
অথচ, মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡنَ یَزۡعُمُوۡنَ اَنَّهُمۡ اٰمَنُوۡا بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡكَ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِكَ یُرِیۡدُوۡنَ اَنۡ یَّتَحَاكَمُوۡۤا اِلَی الطَّاغُوۡتِ وَ قَدۡ اُمِرُوۡۤا اَنۡ یَّكۡفُرُوۡا بِهٖ ؕ وَ یُرِیۡدُ الشَّیۡطٰنُ اَنۡ یُّضِلَّهُمۡ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا ﴿۶۰﴾
“তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা দাবী করে যে নিশ্চয়ই তারা ঈমান এনেছে তার উপর যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং যা নাযিল করা হয়েছে তোমার পূর্বে। তবুও তারা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাগুতকে অস্বীকার করতে। আর শয়তান চায় তাদেরকে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত করতে।” (সূরহ নিসা, আ: ৬০)
তারা প্রয়োজনে সত্য পথের অনুসারীদের বিপক্ষে কাফের/মুশরিকদের সাহায্য করবে এবং সত্য পথের অনুসারীদেরকে তাগুতের হাতে বন্দী করানোর চেষ্টা করবে। যা ঈমান ভঙ্গের কারণগুলোর অন্যতম। তবুও তারা সেটাই করবে।
শয়তান বলেছে- সে মানুষকে ডান দিক থেকে আক্রমণ করবে, তাকে সৎ কাজ করতে দিবে না। দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে জামায়াত বদ্ধ থাকতে দিবে না। আল্লাহর পথে হিজরত ও জিহাদ করতে দিবে না। শয়তান বলেছে সে মানুষকে বাম দিক থেকে আক্রমণ করবে অর্থাৎ সত্যের বিরোধিতা করার জন্য যত প্রকার পদ্ধতি আছে প্রয়োজনে তারা তার সবগুলো পদ্ধতিই ব্যবহার করবে। সত্যপথের অনুসারীদের নামে মিথ্যা অপবাদ দিবে, মুখ ভর্তি মিথ্যা কথা বলবে ইত্যাদি। তারা সত্যের বিরোধিতা করার জন্য সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করবে। তাদের মত চেষ্টা-প্রচেষ্টা মানুষ সত্য পথের জন্যও করতে চায় না। কিন্তু শয়তান ও তার অনুসারীরা মহান আল্লাহ তা‘য়ালার সাহায্য সম্পর্কে ধারণা রাখে না। যে আল্লাহ তা‘য়ালা তার নেককার বান্দাদের সাহায্য করার জন্য, তাদের উপর রহমত নাযিল করার জন্য ঊর্ধ্ব দিক উন্মুক্ত রেখেছেন। হযরত হাকাম ইবন আবান (রহি:) বলেছেন- ইবনে আব্বাস (রা:) বলেছেন- ইবলীস তাদের সম্মুখ দিক থেকে, পিছন দিক থেকে, তাদের ডান দিক থেকে, তাদের বাম দিক থেকে আক্রমণ করবে বলা হয়েছে। কিন্তু সে উর্ধ্ব দিক থেকে তাদের কাছে আসবে বলা হয়নি। কারণ ঊর্ধ্ব দিক থেকে বান্দার প্রতি রহমতই নাযিল হয়ে থাকে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরহ আরাফ ১৭ নং আয়াতের আলোচনা)
হযরত কাতাদা (রহি:) বলেছেন- “হে আদম সন্তান! ইবলীস তোমাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করতে সামর্থ্য হলেও তোমার উর্ধ্ব দিক থেকে তোমার কাছে আসতে পারবে না। ঐ দিক থেকে তোমাদের উপর আল্লাহ তা‘য়ালার রহমত নাযিল হয়। ইবলীস আল্লাহর রহমত ও তাঁর বান্দার নধ্যে অন্তরায় হওয়ার অর্থাৎ মাঝে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় না।” (তাফসির ইবনে কাসির, সূরহ আরাফ ১৭ নং আয়াতের আলোচনা)
অতএব আমরা উর্ধ্ব দিক থেকে আল্লাহর রহমত ও সাহায্যপ্রাপ্ত বান্দা। যাদেরকে শয়তান ও তার অনুসারীরা আক্রমণ করে পরাজিত করতে পারবে না, ইংশাআল্লাহ। أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ তথা আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই।
১৮ নং আয়াত হতে শিক্ষনীয় বিষয়-
(১) যারা শয়তানের পথ অনুসরণ করবে শয়তানের কর্ম বাস্তবায়ন করবে বা করার চেষ্টা করবে এবং মানুষকে সত্য পথে বাঁধা দান করবে, তাদেরকে ও শয়তানকে দিয়ে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা জাহান্নাম পূর্ণ করবেন।
(২) আমাদেরকে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নির্দেশ পালনকারী হিসেবে মৃত্যু বরণ করতে হবে। শয়তানের নির্দেশ পালনকারী হিসেবে নয়। আমাদেরকে মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট আত্মসমর্পণকারী হিসেবে মৃত্যু বরণ করতে হবে। শয়তানের কাছে আত্মসমর্পনকারী হিসেবে নয়। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِهٖ وَ لَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَ اَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ ﴿۱۰۲﴾
“হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (সূরহ আলে ইমরান, আ: ১০২)
অতঃপর শয়তানের প্রতারিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর রসূল ﷺ সকাল-বিকাল মহান আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে নিম্নের দু‘আ পাঠ করতেন–
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأَهْلِي وَمَالِي، اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي، وَآمِنْ رَوْعَاتِي، وَاحْفَظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَيَّ، وَمِنْ خَلْفِي، وَعَنْ يَمِينِي، وَعَنْ شِمَالِي، وَمِنْ فَوْقِي، وَأَعُوذُ بِعَظَمَتِكَ أَنْ أُغْتَالَ مِنْ تَحْتِي.
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আমার দ্বীন, দুনিয়া এবং আপনজন ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা ও বিপদমুক্তি চাচ্ছি। হে আল্লাহ! আমার গোনাহ সমূহ ঢেকে দাও এবং আমাকে ভীতিমুক্ত করে দাও। আর আমাকে সম্মুখ দিক থেকে, পিছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে, বাম দিক থেকে এবং উপর দিক থেকে হেফাজত করে রাখো। হে আল্লাহ! আমি নিম্ন দিক থেকে প্রতারিত হওয়ার হাত থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” (তাফসির ইবনে কাসির, সূরহ আরাফ এর ১৭ নং আয়াতের আলোচনায়, আল কোরআন একাডেমি পাবলিকেশন্স, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা নং ৩১০–৩১১)
দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে আল্লাহর রসূল ﷺ এর
৪ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন
সম্মানিত পাঠক!
আল্লাহর রসূল ﷺ প্রদর্শিত কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়ন করে আমাদের চাওয়া পাওয়ার মনজিলে পৌছাতে আল্লাহর রসূল ﷺ এর দেখানো সরল পথেই আমাদেরকে হাঁটতে হবে। যদিও সেই সরল পথে শয়তানের অসংখ্য ফাঁদ থাকবে সেই সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য।
আমি সেই ফাদের কিছু দৃষ্টান্ত জ্ঞানবান ব্যক্তিদের জানার ও বোঝার জন্য “জানা প্রয়োজন” শিরোনামে সংক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ করেছি।
অতঃপর শয়তান ও তার অনুসারীদের শত ফাঁদ ও বাঁধা বিপত্তির পরেও আমাদেরকে সর্বদা সরল পথেই দৃঢ় অটল থাকতে হবে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর রসূল ﷺ এর ৪ দফা কর্মসূচির মাধ্যমেই আমাদের দ্বীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে হবে।
সেই ৪ দফা কর্মসূচি হলো–
[১] দাওয়াত ও তাবলীগ, [২] ইলমের তা’লিম,
[৩] তাযকিয়াতুন নফস, [৪] জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ
যা আমি ইতিপূর্বে বয়ানে আলোচনা করেছি।
[১] দাওয়াত ও তাবলীগ:
দাওয়াত বাংলায় অধিক প্রচলিত শব্দ হলেও মূলত তা একটি আরবি শব্দ। দাওয়াত (دعوة / دعوات) দাওয়াহ। দাওয়াহ অর্থ ডাকা, আহবান করা, আমন্ত্রণ জানানো। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহর দিকে আহবান করাকে দাওয়াত বলে। দাওয়াতের সংজ্ঞায় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহি:) বলেন- “আল্লাহর দিকে দাওয়াত হলো তাঁর প্রতি এবং তাঁর রসূল যা নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি ঈমান আনা এবং তিনি যেসব বিষয় খবর দিয়েছেন সেসব সত্য বলে স্বীকার করা, আর তাঁর যেসব আদেশ দিয়েছেন তা মান্য করা।” (ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৫তম খন্ড, পৃ: ১৫৭)
আর যিনি মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করে বা দাওয়াত দেয়, ইসলামের পরিভাষায় তাকে দ্বায়ী বলে।
হযরত আবুল বাশার আদম (আ:) থেকে শুরু করে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রসূল হযরত মুহাম্মদ ﷺ পর্যন্ত প্রতিটি নবী-রসূলগণেরই মূল দায়িত্বই ছিলো ‘দাওয়াত’। যেমন মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قُلۡ هٰذِهٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰهِ ۟ؔ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ اَنَا وَ مَنِ اتَّبَعَنِیۡ ؕ وَ سُبۡحٰنَ اللّٰهِ وَ مَاۤ اَنَا مِنَ الۡمُشۡرِكِیۡنَ ﴿۱۰۸﴾
“(হে নবী!) বল, এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরহ ইউসূফ, আ: ১০৮)
যেহেতু মহান আল্লাহ তা‘য়ালা প্রতিটি নবী-রসূলগণ (আ:) কেই আল্লাহর দিকে আহবান করার মূল দায়িত্ব দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রসূল মুহাম্মদ ﷺ কেও একই দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। সেহেতু উম্মাতে মুহাম্মদ ﷺ হিসেবে আমাদেরও মূল দায়িত্বই হলো মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান বা দাওয়াত প্রদান করা।
এখন আমরাও যদি আল্লাহর রসূল ﷺ এর উম্মাত হিসেবে মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত প্রদান করি, তবে অবশ্যই আমাদেরকে প্রথমে জানতে হবে সেই দাওয়াত সম্পর্কে। যেই দাওয়াত প্রদানের জন্য মহান আল্লাহ তা‘য়ালা জমিনে নবী-রসূল (আ:) গণকে পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ لَقَدۡ بَعَثۡنَا فِیۡ كُلِّ اُمَّۃٍ رَّسُوۡلًا اَنِ اعۡبُدُوا اللّٰهَ وَ اجۡتَنِبُوا الطَّاغُوۡتَ ۚ
“আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিকে একজন রসূল প্রেরণ করেছি যে, (তারা বলবে) তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তগুতকে বর্জন কর।” (সূরহ নাহল, আ: ৩৬)
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
فَاتَّقُوا اللّٰهَ وَ اَطِیۡعُوۡنِ ﴿۱۱۰﴾ؕ قَالُوۡۤا اَنُؤۡمِنُ لَكَ وَ اتَّبَعَكَ الۡاَرۡذَلُوۡنَ ﴿۱۱۱﴾ؕ
“(নূহ তার কওমকে বললো) সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। তারা বলল, আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করেছে।” (সূরহ শুআরা, আ: ১১০-১১১)
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
اِذۡ قَالَ لَهُمۡ اَخُوۡهُمۡ هُوۡدٌ اَلَا تَتَّقُوۡنَ ﴿۱۲۴﴾ۚ اِنِّیۡ لَكُمۡ رَسُوۡلٌ اَمِیۡنٌ ﴿۱۲۵﴾ۙ فَاتَّقُوا اللّٰهَ وَ اَطِیۡعُوۡنِ ﴿۱۲۶﴾ۚ
“যখন তাদের ভাই তাদেরকে বলেছিলো, তোমরা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না? নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রসূল। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।” (সূরহ শুআরা, আ: ১২৪-১২৬)
অর্থাৎ প্রতিটি নবী-রসূলগণই মানুষকে প্রথমে দাওয়াত দিয়েছেন তাওহীদ ও রিসালাতের এবং তগুত বর্জনের।
সুতরাং আল্লাহর রসূল ﷺ এর উম্মাত হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিতে হবে। তবে সেই দাওয়াত নিজেদের মনমতো বা মনগড়া দাওয়াত নয়; বরং কুরআন–সুন্নাহর ভিত্তিতেই যে দাওয়াত প্রদানের কথা বলা হয়েছে সেই দাওয়াত। অর্থাৎ, দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু থাকবে তিনটি।
(১) তাওহীদ, (২) রিসালাত, (৩) ত্বগুত বর্জনের শিক্ষা।
যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এই তিনটি বিষয়ের প্রতি সূক্ষ্ম জ্ঞান অর্জন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের অন্যান্য সৎ আমল কোনো কাজেই আসবে না। ছলাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, দান-ছদকার কোনো মূল্যই থাকবে না। সুতরাং দাওয়াতের সুন্নাতি পদ্ধতি হলো- প্রথমে মানুষকে এই তিনটি বিষয়ে দাওয়াত দেওয়া। এর বাহিরে যে বিষয়গুলোর দাওয়াত আছে (মূল তিনটা বিষয় বাদ দিয়ে) বা দাওয়াতের যে পদ্ধতি আছে, সেগুলা হলো বিদয়াত।
জেনে রাখবেন-
“একটি সুন্নাতকে হত্যা করেই ইসলামে একটি বিদয়াত প্রবেশ করে”
সুতরাং দ্বায়ীদের দাওয়াতি কাজ করতে হবে দাওয়াতের সুন্নাহ অনুযায়ী। আল্লাহর রসূল ﷺ দাওয়াত প্রদান করেছেন। তার দাওয়াতের প্রভাবে মূর্তিপূজা, শিরক, ত্বগুতও উৎখাত হয়েছে। আর বর্তমান সময়ের দায়ীগণ ইসালে সওয়াব, তাফসিরুল কুরআন মাহফিল, ইসলামী জালসা, জুমআর খুতবা, মসজিদে মসজিদে সফর ইত্যাদি ভাবে দাওয়াতি কাজ করছে। তাদের দাওয়াতের প্রভাবে দিন দিন মূর্তিপূজা, শিরক, ত্বগুতের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ তারা দাওয়াতের সুন্নাহ অনুযায়ী মানুষকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিচ্ছে না। বরং তারা মানুষের মন খুশি করার জন্য, ইজ্জত লাভের জন্য দাওয়াত প্রদান করে। অথচ মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قُلِ اللّٰهُمَّ مٰلِكَ الۡمُلۡكِ تُؤۡتِی الۡمُلۡكَ مَنۡ تَشَآءُ وَ تَنۡزِعُ الۡمُلۡكَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَ تُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَ تُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِكَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّكَ عَلٰی كُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۶﴾
“বল, হে আল্লাহ! আপনি রাজত্বের মালিক। আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন। এবং আপনি যাকে চান ইজ্জত দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন। আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরহ আলে ইমরান, আ: ২৬)
অত্র আয়াত হতে স্পষ্ট যে, রাজত্বের ক্ষমতা যেমন আল্লাহ তা‘য়ালার হাতে, তেমনি সম্মান দানের ক্ষমতাও মহান আল্লাহ তা‘য়ালার হাতে। কিন্তু বর্তমান সময়ের আলেম পদবীর অধিকাংশ দায়ীগণ সেলিব্রিটি হতে চায়, সম্মান লাভ করতে চায় জনগণের নিকট থেকে।
যেহেতু তারা জনগণের কাছেই সম্মান প্রত্যাশী; সেহেতু জনগণ কেন তাদের কথা, তাদের দাওয়াত গ্রহণ করে তাওহীদপন্থী হবে? দায়ীরাই তো জনগণের কাছে মুখাপেক্ষী। (নাউজুবিল্লাহ)
ফলে ঐ সকল দায়ীর দাওয়াতে সমাজ থেকে শিরক-কুফর উৎখাত না হয়ে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাজেই আমাদেরকে আল্লাহর রসূল ﷺ এর দাওয়াত নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবেই সফলতা আসবে, ইংশাআল্লাহ।
তাবলীগ:
তাবলীগ আরবি শব্দ। যার অর্থ প্রচার করা, সংবাদ বা বার্তা পৌছানো। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّهَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡكَ مِنۡ رَّبِّكَ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَهٗ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡكٰفِرِیۡنَ ﴿۶۷﴾
“হে রসূল! তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও অর্থাৎ তাবলীগ কর। আর যদি তুমি না কর, তবে তুমি তার রিসালাত পৌছালে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” (সূরহ মায়িদাহ, আ: ৬৭)
অর্থাৎ, মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আল্লাহর রসূল ﷺ কে তাবলীগ করতে আদেশ করেছেন। আর এমন দাওয়াত বা দাওয়াতের তাবলীগ করতে বলেছেন, যে দাওয়াতের তাবলীগ করলে সেই সময়কার কাফের, মুশরিক ও ত্বগুতের পক্ষ হতে বড় ধরণের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ভাবার্থে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেছেন- তুমি তাবলীগ করো অর্থাৎ পৌঁছে দাও তাওহীদ, রিসালাত আর ত্বগুত বর্জনের আহবান মানুষের নিকট।
অতঃপর আল্লাহ তা‘য়ালা বলেছেন-
وَ اللّٰهُ یَعۡصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡكٰفِرِیۡنَ ﴿۶۷﴾
“আর আল্লাহ তোমাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” (সূরহ মায়িদা, আয়াত ৬৭ এর শেষাংশ)
অর্থাৎ, আল্লাহর রসূল ﷺ প্রথম দফায় তাঁর দাওয়াত সকল মানুষের নিকট তাবলীগ করতেন অর্থাৎ পৌঁছে দিতেন।
[২] ইলমের তা’লিম:
সম্মানিত পাঠক! যারা আল্লাহর রসূল ﷺ এর দাওয়াত গ্রহণ করতেন, তাদেরকে নিয়ে তিনি “ইলমের তা‘লিম” করাতেন।
হযরত আনাস (রা:) বলেন, “আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন- প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ইলম অর্জন করা ফরজ।” (সুনানে নাসাঈ ২২৪, মান-সহিহ)
এখন প্রশ্ন থাকে যে, কতটুকু ইলম অর্জন করা ফরয? ইলম অর্জন করার তো শেষ নাই। মানুষের জন্ম হতে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত ইলম অর্জনের সময়। তাহলে কি প্রত্যেক মুসলমানকে কুরআনের হাফেজ হতে হবে? অথবা আলেম হতে হবে? অথবা মুফতি কিংবা মুহাদ্দিস হতে হবে?
উত্তর: না। প্রত্যেক মুসলিমকেই হাফেজ, আলেম, মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দিস হতে হবে, ইলম অর্জনের এটা কোনো শর্ত না। অতঃপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যে ইলম অর্জনের শেষ নেই, এ কথা সত্য। তবে অবশ্যই ইলম অর্জনের শুরু রয়েছে, যে শুরুটা আমাদের সবাইকে জানতে হবে। যেমন: হযরত উমার ইবনে খত্তাব (রা:) বলেন- “আমরা একদিন আল্লাহর রসূল (ছ:) এর নিকট বসেছিলাম। হঠাৎ একটি লোক আমাদের কাছে এলো। তার পরনে ধবধবে সাদা কাপড় এবং তার চুল কুচকুচে কালো ছিলো। সফরের কোনো চিহ্ন তার উপর দেখা যাচ্ছিলো না। এবং আমাদের মধ্যে কেউ তাকে চিনছিলো না। শেষ পর্যন্ত সে নবী ﷺ এর কাছে বসলো। তাঁর দুই হাটু নবী ﷺ এর দুই হাটুর সাথে মিলিয়ে দিলো এবং তার হাতের দুই করতলকে নিজ জানুর উপর রেখে বলল- হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন। অতঃপর আল্লাহর রসূল ﷺ বললেন- ইসলাম হলো যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মদ আল্লাহর রসূল। ছলাত প্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমাদানের সিয়াম পালন করবে এবং কাবা ঘরের হাজ্জ করবে যদি সেখানে যাবার সামর্থ রাখো। সে (আগন্তুক ব্যক্তি) বললো, আপনি ঠিকই বলেছেন।” (রিয়াদূস ছলিহিন ৬১; ছহিহ মুসলিম, হা: ১)
অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত, হযরত ইবনু আব্বাস (রা:) বলেন- আব্দুল কায়েস গোত্রের এক প্রতিনিধি দল নবী ﷺ এর কাছে এসে পৌছালে আল্লাহর রসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, এরা কোন গোত্রের লোক? তিনি বললেন- গোত্র বা প্রতিনিধি দলকে মোবারকবাদ। অপমান ও অনুতাপবিহীন অবস্থায় আগত প্রতিনিধি দলকে মোবারকবাদ। প্রতিনিধি দল আরয করলো- হে আল্লাহর রসূল! আপনার ও আমাদের মধ্যে কাফির যুদ্ধবাজ মুযার গোত্র অন্তরায়স্বরূপ থাকায় হারাম মাস ব্যতীত অন্য মাসে আপনার নিকট আসতে পারি না। তাই আপনি হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী এমন কিছু পরিষ্কার নির্দেশ দিন যা আমরা মেনে চলব এবং যাদেরকে দেশে রেখে এসেছি তাদেরকে গিয়ে বলতে পারব। যা দ্বারা আমরা সহজে জান্নাতে যেতে পারি। এর সাথে তারা নবী ﷺ কে পানীয় বস্তু (পান পাত্র) সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করলেন। জবাবে আল্লাহর রসূল ﷺ তাদেরকে চারটি কাজের আদেশ দিলেন। আর চারটি কাজ করতে নিষেধ করলেন। প্রথমে তিনি তাদেরকে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আদেশ করলেন এবং বললেন- আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ কি, তা কি তোমরা জানো? তারা জবাবে বলল- আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ﷺ অধিক ভালো জানেন। তিনি বললেন- (১) আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল, এ সাক্ষ্য দেয়া, (২) ছলাত ক্বায়িম করা, (৩) যাকাত প্রদান করা, (৪) এবং রমাদ্বান মাসে সিয়াম পালন করা। এরপর (চারটি কাজ ছাড়াও) গণীমতের ‘খুমুস’ দেয়ার হুকুম দিলেন।
অতঃপর তিনি ﷺ চারটি পান পাত্র ব্যবহারে নিষেধ করলেন। এগুলো হলো- হানতাম (নিকেল করা সবুজ পাত্র), দুব্বা (কদুর খোল দ্বারা প্রস্তুতকৃত পাত্র বিশেষ), নাকীর (গাছের বা কাঠের পাত্র বিশেষ), মুযাফফাত (তৈলাক্ত পাত্র বিশেষ)। তিনি ﷺ আরো বলেন- সকল কথা ভালোভাবে স্বরণ রাখবে। যাদের দেশে ছেড়ে এসেছো তাদেরকেও বলবে। (ছহিহ বুখারী, হা: ৫৩; ছহিহ মুসলিম, হা: ১৭)
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত-
হযরত আবু হুরাইরা (রা:) বলেন, জৈনক বেদুইন লোক নবী ﷺ এর কাছে
এসে বললেন- হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন একটি সন্ধান দিন যা করলে আমি সহজে জান্নাতে পৌঁছাতে পারি। তিনি ﷺ বললেন- আল্লাহর ইবাদত করতে থাকবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না, ছলাত কায়িম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং রমাদানের সিয়াম পালন করবে। এ কথা শুনে লোকটি বললো- আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার জীবন রয়েছে! আমি এর থেকে বেশিও করবো না, কমও করবো না। সে লোক যখন চলে গেলো, তখন নবী ﷺ বললেন- কেউ যদি জান্নাতি কোন লোককে দেখে আনন্দিত হতে চায়, সে যেন এ লোককে দেখে। (ছহীহ বুখারী, হা: ১৩৯৭; মুসলিম, হা: ১৪)
অতএব অত্র হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইলম অর্জনের শেষ না থাকলেও ইলম অর্জনের শুরু রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ রসূল ﷺ প্রত্যেক মুসলিম নর–নারীর উপর যেই ইলম অর্জন করা ফরয বলেছেন। সেই ইলমের শুরু ঈমান আক্বিদাহ দিয়ে। সুতরাং, কোন ব্যক্তি মুসলিম হতে হলে তাকে অবশ্যই বিশুদ্ধ ঈমান ও আক্বিদাহ এর উপর ইলম অর্জন করতে হবে। তারপর ছলাত আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, সিয়াম পালন করা, সামর্থ্যবানদের হজ্জ করা, জিহাদ করা ইত্যাদি ইলম অর্জন করতে হবে। আল্লাহর রসূল ﷺ তাঁর দাওয়াত গ্রহণকারী সাহাবাগণ (রা:) কে নিয়ে ২য় দফা কর্মসূচি “ইলমের তা’লিম” বাস্তবায়ন করেছেন।
[৩] তাযকিয়াতুন নফস:
সম্মানিত পাঠক! তাযকিয়াতুন নফস অর্থ নফস পবিত্রকরণ বা নফসের বিশুদ্ধতা বা নফস পরিশুদ্ধ করা।
যারা আল্লাহর রসূল ﷺ এর দাওয়াত গ্রহণ করেছেন এবং আল্লাহর রসূল ﷺ এর নিকট ইলমের তা’লিম গ্রহণ করেছেন, আল্লাহর রসূল ﷺ মূলত তাদের অন্তরের পরিশুদ্ধতার জন্যই ইলমের তা’লিম করিয়েছেন। কেননা ইলম অর্জনের সাথে অন্তরের পরিশুদ্ধতা বা তাযকিয়াতুন নফস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেমন মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
رَبَّنَا وَ ابۡعَثۡ فِیۡهِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡهُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡهِمۡ اٰیٰتِكَ وَ یُعَلِّمُهُمُ الۡكِتٰبَ وَ الۡحِكۡمَۃَ وَ یُزَكِّیۡهِمۡ ؕ اِنَّكَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَكِیۡمُ ﴿۱۲۹﴾
“(ইবরাহীম ও ইসমাঈল দুআ করেছিলো) হে আমাদের রব! তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবে, আর তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরহ বাকারহ, আ: ১২৯)
অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) বলেন- “এই দু‘আয় হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং হযরত ইসমাইল (আ:) যে রসূলের কথা বলেছিলেন, তিনি হচ্ছেন খতামুন্নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ ﷺ। হযরত মুহাম্মদ ﷺ কে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা গোটা মানব জাতির কল্যানের জন্য ইসমাইলের বংশধরদের মধ্য থেকে প্রেরিত রসূল হিসেবে পূর্বেই নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। হযরত ইবরাহীম (আ:) ও হযরত ইসমাইল (আ:) এর দু‘আ আল্লাহ তা‘য়ালা পূর্বেই তার ফায়সালা অনুরূপ ছিলো।” (তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরহ বাকারহ ১২৯ নং আয়াতের আলোচনা)
হযরত আবুল আলিয়া (রহি:) বলেন- “আলোচ্য বর্ণিত হযরত ইবরাহীম (আ:) এবং হযরত ইসমাইল (আ:) এর দুআয় যে রসূলের বিষয় উল্লেখিত হয়েছে। তিনি হচ্ছেন নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ। হযরত ইবরাহীম (আ:) এর সে দু‘আর পর আল্লাহ তা‘য়ালা তাকে বলেছিলেন- তোমার দু‘আ কবুল করলাম। সেই রসূল আখিরী জামানায় আবির্ভূত হবেন।” (তাফসির ইবনে কাসির, সূরহ বাকারহ ১২৯ নং আয়াতের আলোচনা)
হযরত আবু উমামা (রা:) বলেন- “একদিন আমি নবী ﷺ কে জিজ্ঞেস করলাম– হে আল্লাহর রসূল! আপনার আত্মপ্রকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের বিবরণী কি? নবী ﷺ বললেন- আমার আত্মপ্রকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের বিবরণী হচ্ছে- আমার পিতা ইবরাহীম (আ:) আমার জন্য দু‘আ করেছিলেন। ঈসা (আ:) আমার আগমনী সুসংবাদ দিয়েছিলেন এবং আমার মা স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, তাঁর মধ্য থেকে একটি জ্যোতি বের হয়ে শাম দেশের প্রাসাদসমূহ জ্যোর্তিময় করেছে।” (তাফসির ইবনে কাসির, সূরহ বাকারহ ১২৯ নং আয়াতের আলোচনা)
কুরআন মাজিদ এর অত্র আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুরআন তিলাওয়াত, কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষার সঙ্গে পবিত্রতা অর্থাৎ তাযকিয়ার সম্পর্ক রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। আর অত্র আয়াতটি আল্লাহর রসূল ﷺ এর জন্যই বিশেষ করে; যা আয়তের ব্যাখ্যা হতে স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর রসূল ﷺ এর ২য় দফা কর্মসূচি ‘ইলমের তা‘লিম’ এর সাথে তাযকিয়ার সম্পর্ক একটি ধারাবাহিক নিয়ম। সুতরাং, ইলমের সঙ্গে তাযকিয়ার সম্পর্ক জড়িত। আর তা মূলত দুইটি কারণে–
১। যে ব্যক্তি যত ইলমের গভীরতা অর্জন করবে, সে তত বেশি অন্তর পরিশুদ্ধ করতে পারবে। কেননা ইলম শূন্য ব্যক্তিদের অন্তরচক্ষু অন্ধ থাকে। আর অন্তরচক্ষু অন্ধ থাকলে সে কিভাবে অন্ততরকে পবিত্র করবে। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قُلۡ مَنۡ رَّبُّ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ قُلِ اللّٰهُ ؕ قُلۡ اَفَاتَّخَذۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِهٖۤ اَوۡلِیَآءَ لَا یَمۡلِكُوۡنَ لِاَنۡفُسِهِمۡ نَفۡعًا وَّ لَا ضَرًّا ؕ قُلۡ هَلۡ یَسۡتَوِی الۡاَعۡمٰی وَ الۡبَصِیۡرُ ۬ۙ اَمۡ هَلۡ تَسۡتَوِی الظُّلُمٰتُ وَ النُّوۡرُ ۬ۚ
“বল! আসমান সমূহ ও জমিনের রব কে? বল, আল্লাহ। তুমি বল, তোমরা কি তাকে ছাড়া এমন কিছুকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছো, যারা তাদের নিজেদের কোন উপকার অথবা অপকারের মালিক না? বল, অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে?” (সূরহ রা‘দ, আ: ১৬)
আর অন্তর চক্ষু অন্ধ থাকলে সে ব্যক্তি কিভাবে তার অন্তরকে পবিত্র করতে পারবে? কাজেই আসমানী ইলম অর্জন করে সত্যকে সত্য বলে গ্রহণ করে নিজের অন্তর চক্ষুকে প্রথমে চক্ষুষ্মান করতে হবে। তবেই অন্তর পবিত্র হবে, ইংশাআল্লাহ।
২। যে ব্যক্তি ইলমের গভীরতা অর্জন করতে গিয়ে অধিক ইলম অর্জন করেছে এবং হাফেজ, আলেম, মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দিস হয়েছে। কিন্তু আসমানী ইলমের গভীরতা অর্জন করতে পারে নাই বরং ইলমের আধিক্য অর্জন করেছে। অর্থাৎ বড় বড় আলেম হয়েছে যা উলামায়ে সূ এর অন্তর্ভুক্ত।
অর্থাৎ, ইলমের তা‘লিমের মাধ্যমে আল্লাহর রসূল ﷺ সাহাবা (রা:) গণের অন্তর পবিত্র করতেন। ফলে সাহাবা (রা:) নম্র, ভদ্র, বিনয়ী হতো। কারণ তারা ইলমের গভীরতা অর্জন করতেন। আর যারা ইলম অর্জন করতে গিয়ে ইলমের গভীরতা অর্জন না করে অধিক ইলম অর্জন করে বা ইলমের আধিক্য অর্জন করে এবং সেই ইলম নিয়ে গর্ব অহংকার করে। নিজেকে আলেম, আকাবির হিসেবে জাহির করে এবং অন্যান্য মানুষদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে; তারা মূলত ইলম অর্জন করে কিন্তু তাদের এই ইলম দ্বারা অন্তর পবিত্র করতে পারে না। ফলে তারা ইলমের অহংকারী হয়ে যায়। এবং তারা আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার জীবনকেই অধিক প্রাধান্য দেয়। ইসলামের ভাষায় এই সকল আলেমকে “আলেমে সূ” বলা হয়। আর এই “আলেমে সূ” সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ:) বলেন-
“তোমরা দুনিয়ার জন্য কাজ করছো অথচ এখানে কাজ ব্যতিরেকেই তোমাদেরকে রিযিক দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে তোমরা পরকালের জন্য কাজ করছো না, অথচ সেখানে কাজ ছাড়া কোনো প্রতিদান দেওয়া হবে না। ওহে ভন্ড আলেমদের দল, ধ্বংস তোমাদের! তোমরা বিনিময় গ্রহণ করছো এবং আমল বরবাদ করছো। অথচ দুনিয়া থেকে বেরিয়ে কবরের অন্ধকার ও তার সংকীর্ণতায় তোমাদের ঢোকার সময় অত্যাসন্ন। আল্লাহ তা‘য়ালা যেভাবে তোমাদেরকে ছলাত ও ছিয়ামের আদেশ দিয়েছেন তেমনিভাবে পাপ কাজ করতেও নিষেধ করেছেন। সে কেমন করে আলেম হয়, যার পরকালের তুলনায় দুনিয়া বেশি অগ্রাধিকার পায়। যার আসক্তি দুনিয়ার প্রতিই বেশি? সে কেমন করে আলেম হয়, যার যাত্রাপথ পরকালের দিকে অথচ মুখ দুনিয়ার দিকে এবং যার কাছে কল্যাণকর বস্তুর তুলনায় ক্ষতিকর বস্তু অধিক লোভনীয়?
সে কেমন করে আলেম হয়, যে তা রিযিককে অপছন্দ করে এবং পদমর্যাদাকে তুচ্ছ মনে করে, অথচ সে জানে এসব কিছুই আল্লাহ তা‘য়ালার জ্ঞান-ক্ষমতার অধীনেই?
সে কেমন করে আলেম হয়, যে তার বিপদ-মুসিবতের জন্য আল্লাহ তা‘য়ালাকে দোষারোপ করে?
সে কেমন করে আলেম হয়, যে কথা শিখে নিছক বাগ্মিতা জাহির করার জন্য, আমল করার জন্য নয়?” (রসূলের চোখে দুনিয়া, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহি:), পৃ: ১৮৮, হা: নং: ৪১২; তরজমায়ে সূরহ মুহাম্মদ, প্রথম পর্ব, পৃ: ৪৪-৪৫)
খিলাফতের ভূমির নীতি-নৈতিকতা দৃঢ় রাখার জন্য ভূমির নাগরিকগণের নফস পবিত্রকরণ অপরিহার্য। তা ব্যতীত খিলাফতের ভূমিতেও মানুষ ন্যায়বিচার পাবে না। আত্মসাৎ, মানুষ হত্যা, অনৈতিকতা, সুদ-ঘুষ জেঁকে বসবে। সে জন্যই আল্লাহর রসূল ﷺ তার সাহাবা (রা:) গণকে ইলমের তা’লিমের মাধ্যমে তাযকিয়াতুন নফস বা অন্তর পবিত্র করতেন।
[৪] জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ:
সম্মানিত পাঠক!
আল্লাহর রসূল ﷺ তাঁর দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে। এবং শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকতার মাধ্যমে বিশ্ব মানবতাকে যেই আদর্শ এবং জীবনব্যাবস্থা ইসলাম বিশ্বের কল্যাণের জন্য উপহার দিতে চেয়েছিলেন তাতে মুশরিকরা অস্ত্র দ্বারা কঠোরভাবে বাঁধা প্রদান করলো। তখন আল্লাহর রসূল ﷺ তাদের সেই বাঁধার সম্মুখীন হয়ে তাঁর দাওয়াহ এর কাজ বন্ধ না করে আরো জোর গতিতে শুরু করলেন এবং ইসলামের ভূমি নির্ধারণ করে আল্লাহর রসূল ﷺ মুশরিকদের অস্ত্রের মোকাবেলা অস্ত্র দিয়ে করলেন। আর সেটাই হলো আল্লাহর পথে জিহাদ অর্থাৎ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا هَلۡ اَدُلُّكُمۡ عَلٰی تِجَارَۃٍ تُنۡجِیۡكُمۡ مِّنۡ عَذَابٍ اَلِیۡمٍ ﴿۱۰﴾ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ تُجَاهِدُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ بِاَمۡوَالِكُمۡ وَ اَنۡفُسِكُمۡ ؕ ذٰلِكُمۡ خَیۡرٌ لَّكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿ۙ۱۱﴾
“হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? আর তা হলো এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর; যদি তোমরা জানতে।” (সূরহ সফ, আ: ১০-১১)
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَهُمۡ وَ اَمۡوَالَهُمۡ بِاَنَّ لَهُمُ الۡجَنَّۃَ ؕ یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ فَیَقۡتُلُوۡنَ وَ یُقۡتَلُوۡنَ ۟ وَعۡدًا عَلَیۡهِ حَقًّا فِی التَّوۡرٰىۃِ وَ الۡاِنۡجِیۡلِ وَ الۡقُرۡاٰنِ ؕ وَ مَنۡ اَوۡفٰی بِعَهۡدِهٖ مِنَ اللّٰهِ فَاسۡتَبۡشِرُوۡا بِبَیۡعِكُمُ الَّذِیۡ بَایَعۡتُمۡ بِهٖ ؕ وَ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿۱۱۱﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে সশস্ত্র যুদ্ধ করে। অতএব তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর নিজ ওয়াদা পূরণে আল্লাহর চেয়ে অধিক কে হতে পারে? সুতরাং তোমরা (আল্লাহর সঙ্গে) যে ব্যবসা করেছো, সে ব্যবসার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই মহা সাফল্য।” (সূরহ তাওবা, আ: ১১১)
অত্র আয়াত দুটিতে নফসের জিহাদ বা কিতাব লিখার জিহাদ কিংবা প্রচারের জিহাদের কথা উল্লেখ করেন নি! বরং মহান আল্লাহ তা‘য়ালা অত্র আয়াত দুটিতে সশস্ত্র যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন।
এখন প্রশ্ন হতে পারে এ যুদ্ধ কতদিন বা কতক্ষণ চলবে। মানুষকে তো স্বাভাবিক জীবন পরিচালনাও করতে হবে?
উত্তর:- হ্যাঁ, মানুষকে স্বাভাবিক ভাবেও জীবন পরিচালনা করতে হবে। তবে এটা জেনে রাখুন মহান আল্লাহ তা‘য়ালার আদেশ পালনের মধ্য দিয়েই জীবন পরিচালনা করাটাই হলো স্বাভাবিকভাবে জীবন পরিচালনা করা। আর মহান আল্লাহ তা‘য়ালা নিজেই উল্লেখ করেছেন কতক্ষণ বা কত দিন সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হবে। যেমন মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ قَاتِلُوۡهُمۡ حَتّٰی لَا تَكُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّ یَكُوۡنَ الدِّیۡنُ كُلُّهٗ لِلّٰهِ ۚ فَاِنِ انۡتَهَوۡا فَاِنَّ اللّٰهَ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۳۹﴾
“আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না ফিতনার অবসান হয় এবং দ্বীন পূর্নরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। তবে যদি তারা বিরত হয় তাহলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘য়ালা তারা যা করে সে বিষয়ে সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরহ আনফাল, আ: ৩৯)
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
وَ قٰتِلُوۡهُمۡ حَتّٰی لَا تَكُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّ یَكُوۡنَ الدِّیۡنُ لِلّٰهِ فَاِنِ انۡتَهَوۡا فَلَا عُدۡوَانَ اِلَّا عَلَی الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۱۹۳﴾
“আর তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ কর, যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। সুতরাং তারা যদি বিরত হয়, তাহলে জালিমরা ছাড়া (কারো উপর) কোনো কঠোরতা নেই।” (সূরহ বাকারহ, আ: ১৯৩)
অর্থাৎ, ততক্ষণ পর্যন্ত এই সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর জমীন হতে ফিতনা নির্মূল না হয় এবং আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হয়।
অত্র আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসির (রহি:) বলেন- “বায়ান ইবনে ওবারা (রহি.), সাঈদ ইবনে জোবায়ের (রহি.) এর সনদে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন, ইবনে উমার (রা:) আমার কাছে আসলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম ফিতনা নির্মূলের জন্য যুদ্ধ করা সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? তিনি বললেন- ফিতনা কাকে বলে, তোমরা জানো কি? মুহাম্মদ ﷺ মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। আর তোমরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। অথচ তাদের উপর চড়াও হওয়াই ছিলো ফিতনা। তোমাদের যুদ্ধ তো খিলাফতের ভূমি বিজয়ের জন্য হয় না।” (তাফসির ইবনে কাসির, সূরহ আনফালের ৩৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়, পৃ: ৬৪৫)
হযরত আলী ইবনে যায়েদ (রহি:), আইউব ইবনে আব্দুল্লাহ লাখমী (রহি:) এর সনদে হাম্মাদ ইবনে সালমা (রহি:) বলেন- “আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) এর কাছে ছিলাম। এ সময় এক লোক এসে বললো- আল্লাহ তা‘য়ালা কুরআনুল কারীমে বলেছেন- ‘وَ قَاتِلُوۡهُمۡ حَتّٰی لَا تَكُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّ یَكُوۡنَ الدِّیۡنُ كُلُّهٗ لِلّٰهِ‘। ইবনে উমার (রা:) বললেন- আমরা যুদ্ধ করেছি, যার ফলে ফিতনা নির্মূল হয়েছে এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তোমরা যুদ্ধ করছো, যার ফলে আরো ফিতনা জন্ম নিচ্ছে এবং দ্বীন গাইরুল্লাহর জন্য হচ্ছে।” (তাফসির ইবনে কাসির, সূরহ আনফালের ৩৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়, পৃ: ৬৪৫)
অতএব অত্র আয়াত ও তার ব্যাখ্যা হতে স্পষ্ট হয় যে, ফিতনা হলো শিরক-কুফর। আর ফিতনা নির্মূল হলো আল্লাহর জমিন থেকে শিরক-কুফরকে উৎখাত করে আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা। আর মুমিনদের যুদ্ধ মুশরিকদের সাথে যারা মূর্তিপূজা করে, ত্বগুতের বিধান মানে, ত্বগুতের কাছে আনন্দ চিত্তে জেনে বুঝে বিচার প্রার্থী হয়। এবং যারা আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে বাঁধা দান করে, খিলাফাতের ভূমি প্রতিষ্ঠার কাজে বিরোধিতা করে।
অর্থাৎ কাফের, মুশরিক, মুনাফিকরা ফিতনা। আর খিলাফাতের ভূমি প্রতিষ্ঠার কাজে বিরোধিতাকারী বিদ্রোহীরা ফিতনা।
ইংশাআল্লাহ শত ফিতনার চির অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবো। খিলাফাতের ভূমি মুসলিম উম্মাহকে উপহার দেব, ইংশাআল্লাহ।
পরিশেষে আমি মাহমুদ বিন আব্দুল ক্বদীর সে কথাই বলতে চাই, যে কথা আল্লাহ তার রসূল ﷺ কে বলতে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তা হলো, মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন-
قُلۡ هٰذِهٖ سَبِیۡلِیۡۤ اَدۡعُوۡۤا اِلَی اللّٰهِ ۟ؔ عَلٰی بَصِیۡرَۃٍ اَنَا وَ مَنِ اتَّبَعَنِیۡ ؕ وَ سُبۡحٰنَ اللّٰهِ وَ مَاۤ اَنَا مِنَ الۡمُشۡرِكِیۡنَ ﴿۱۰۸﴾
“(হে নবী!) বল, এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরহ ইউসূফ, আ: ১০৮)
আলহামদুলিল্লাহ,
লেখা শেষ হওয়ার তারিখ: ০৮/০১/২০২৬ ঈসায়ী
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ

